Sunday, June 22, 2014

আকাশ ঢাকা দৈত্য গাছেদের দল (যত্তোসব)...

Ancient Giant Sequoia Trees - Nature's ever-growing wonders...
...
.....
অতি ধীর কচ্ছপের গতিতে চলতে চলতে আমরা শেষমেষ সিকোয়া ন্যশনাল পার্কের ঢোকার মুখের কাছাকাছি চলে আসলাম। সামনে গাড়িদের বিশাল লম্বা লাইন। লং উইকেন্ড বলে যেন সারা ক্যালিফোর্নিয়ার লোকজন এখানে চলে এসেছে - আধ মাইল স্পিডে গাড়ি এগুচ্ছে। মাথার উপরে ঝকঝকে, ঘন নীল আকাশ - দেখেই মনে হয় ফটোশপড - নাহলে এতো নীল হয় কি করে? আমাদের পাশে পাশেই চলেছে হালকা জঙ্গুলে জায়গা। আমাদের ঠিক সামনের একটা কনভার্টিবলে এক ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রী (সম্ভবত:) খুব করুণ মুখ করে বসে আছেন। গাড়ির নেমপ্লেটে লেখা: 'KANCHWA' - দেখেই আমার 'কানচা রে কানচা রে, প্যার মেরা সাচ্চা, রুক যা না-যা দিল তোড়কে...' বলে গান গাওয়ার বেজায় ইচ্ছা হতে লাগলো। একটু পরে সামনের সেই দুঃখী মানুষদ্বয় বিরক্ত হয়ে গাড়ির ছাদটা লাগিয়ে দিলো! অবশেষে গেটের কাছে এসে আমরা পার্কে ঢোকার টিকিট কিনে নিলাম। এক্কেবারে দুর্গম জায়গা - কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, খাবার দোকানপত্র কিচ্ছু নেই, গার্বেজ-বিন প্রায় চোখেই পড়ে না - কিন্তু পার্কিং লট আর স্যানিটারী টয়লেট ঠিক বানিয়ে রেখেছে। রেস্টরুমখানা আবার কাঠের লগের সুদৃশ্য বাড়ির মতো দেখতে। ভুলে করে আমি আবার সেটার খান কয়েক ছবি তুলে নিলাম!! যাই হোক এবার সিকোয়া ন্যশনাল পার্কের মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো আমাদের - ধীরে সুস্থে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাড়ি জমালাম। ধীরে সুস্থে কথাটা অবশ্যি ঠিক নয় - বেশ আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ - জিকজ্যাক মোচড় - 90 ডিগ্রী নয়, একেবারে 180 ডিগ্রীর মোচড়। এক মোচড় দিয়ে গাড়ি সোজা করতে না করতেই আরেকটা এসে হাজির হয়। রাস্তার পাশে রেলিং-ফেলিং বলে কিছু নেই। মাঝে মাঝেই পাশে খাড়া খাদ - সেইখানে আবার এক্সট্রা খাতির হিসেবে বিশাল থামের মতো ইয়া লম্বা লম্বা সিকোয়া গাছ। এর মধ্যে আরেক জ্বালা হলো, উপরে উঠছি বলে কান বন্ধ হয়ে শ্রবণশক্তি লোপ পেতে চলেছে। রাস্তার আশে পাশে 60 ডিগ্রীতে খাড়া খাড়া পর্বতের ঢাল উঠে গেছে। সেই ঢালগুলোতে আবার 30 ডিগ্রী কোণে অগুন্তি সিকোয়া আর পাইন গাছ। পথের মাঝে মাঝে এক একটা পর্বত সামনা-সামনি অ্যাতো কাছে চলে আসছে যে বুক ধ্বক করে ওঠে।

থাকি একটা মেগা-সিটিতে - অর্ধেক জীবন কাটিয়ে দিয়েছি উঁচু উঁচু বিল্ডিং আর মনুমেন্ট দেখে। কলকাতায় সাউথ সিটির পঁয়ত্রিশতলা বিল্ডিং-এর টংয়ে উঠেছি। শিকাগোর সীয়ার্স টাওয়ারে চড়েছি - টরন্টোর সিএন টাওয়ারেও ওঠা হয়েছে। কিন্তু এরকম বিশাল কিছু আমি বাস্তবে কেন, স্বপ্নেতেও কখনো দেখিনি। দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে, উচ্চতা, গভীরতায়, অপ্রতিসমতায়, কোনভাবেই কোন কিছুর সাথেই আমি এই গাছগুলোর তুলনা করতে পারছিলাম না। এরা অ্যাতোটাই উঁচু, আর বিশাল যে সরাসরি উপরের দিকে না তাকালে আকাশ আর দেখা যায় না। চিন্তার অতীত কোন প্রাচীনকালে এই দৈত্য-সমাকৃতি গাছেদের সৃষ্টি হয়েছিলো - আরও অনিদির্ষ্ট কাল থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এরা দাঁড়িয়ে আছেই তো আছে। দেখলেই কেমন জানি নিজেকে খুব ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, আর নশ্বর বলে মনে হয়। ছোটবেলায় গাছের মাথায় বাড়ি বানিয়ে থাকার খুব শখ হতো - আমাদের বাগানের বড়ো আমগাছটায় উঠে, তার দুই বিশাল কান্ডের জয়েন্টে গ্যাট্টুস হয়ে বসে থাকতাম। কিন্তু আজ এই সব বিশাল বিশাল গাছ দেখে হঠাৎ করে মন বলে উঠলো, 'বাপধন, সে শখের দরকার তোর আর নেই...'

Tuesday, June 10, 2014

আবার একটা বিশ্বকাপ এসে গেলো !!

1982 সালের বিশ্বকাপ - পড়ি তখন ক্লাস থ্রী, কি ফোরে। কোথায় বিশ্বকাপ হচ্ছে তা জানি না, জানার দরকারও ঠিক মনে আসেনি, কারণ কলকাতার মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের থেকে ফাটাফাটি খেলা, জগতে আর কোথাও
হতে পারে, এই বিশ্বাস তখনও জন্ম নেয় নি। ছোটদার মুখে একদিন শুনলাম 'জিকো' বলে নাকি ব্রাজিলের এক দূর্ধর্ষ প্লেয়ার আছে, যাকে অনেকে 'সাদা পেলে' বলে ডাকে। এই কথাটা শুনে নড়েচড়ে বসলাম। কারণ ব্রাজিলের নাম একটু আধটু শুনলেও, 'পেলে' আমাদের প্রায় ঘরের, আদরের ছেলে - বিশেষ করে তার গায়ের রং 'কালো' বলে, তাকে যেন আরও বেশী করে ভালো লাগে। আমাদের তখন টিভি কেনার মতো সামর্থ্য আসেনি। শুধু টিভি কেন, মাঠে গিয়ে সত্যিকারের চামড়ার ফুটবলে খেলার মতো পয়সাও পাড়ার ক্লাবটার ছিলো না। বাড়ি থেকে মাঝে মধ্যে দু-একটা সস্তা, প্লাস্টিকের ছোটো ছোটো বল কিনে দিতো - তাই নিয়েই খুব খেলতাম - মাঝে-সাঝে বাতাবি লেবুও দিব্যি ফুটবলের কাজ করে দিতো !! বাড়িতে সব দাদাই কম-বেশী ফুটবল খেলতে ভালোবাসতো। ছোটদা বললো, 'চল, আমার এক বন্ধুর বাড়িতে টিভি আছে - সেখানে তোকে নিয়ে যাবো - ব্রাজিল আর রাশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়ন) খেলা দেখতে পাবি...' - শুনেই এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। 'সাদা পেলে'-কে দেখার সুযোগ কি কেউ ছাড়ে !! মনে মনে ঠিক করে নিলাম যে আমি রাশিয়া, অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নকেই সাপোর্ট করবো। কারণ বাড়িতে তখন 'মিশা' আর 'সোভিয়েত দেশ' নামে দুটো রাশিয়ান ম্যাগাজিন আসে, খোদ মস্কো থেকে পোস্টাল সার্ভিসে। সেই সব বইয়ের (বাংলায় অনুবাদ করা) গল্পগুলো পড়তে মন্দ লাগেনা - তার থেকেও বড়ো কথা ওই সব বইয়ের পাতার কোয়ালিটি খুব ভালো। বই-খাতার 'মলাট' দিতে আর বিশেষ করে কালীপূজার সময় 'ছুঁচো বাজি'-র খোল তৈরী করতে সেগুলো খুব কাজে আসে!! তাছাড়া জ্ঞান হওয়া থেকেই শুনে আসছি, অ্যামেরিকা মানেই 'নোংরা, অসভ্য, লোচ্চা - শয়তানের দেশ, ক্যাপিটালিস্ট কান্ট্রি' - অন্যদিকে 'রাশিয়া' মানেই 'মার্ক্সবাদ', অর্থাৎ স্বর্গ। এমন কি রাশিয়ানদের 'হাগু-পাদু'ও নাকি বেশ সুস্বাদু!!

তো, সেই রাতে ছোটদার সাথে সাইকেলে করে গেলাম তার সেই বড়লোকি বন্ধুর বাড়ি - গিয়ে দেখি চারিদিক সব কেমন যেন চুপচাপ, শুনশান। আস্তে করে ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখি, আরে ব্বাপ - এ তো জন-সমুদ্র !! ঘরভর্তি একগাদা লোক - কচি-কাচা থেকে ইয়ং থেকে বুড়ো, যে যেখানে পেরেছে বসে গেছে। খেলা তখন অলরেডি শুরু হয়ে গেছে - সবাই হাঁ-করে সাদা-কালো ছোট্ট একটা টিভির পটলের মতো স্ক্রিনটার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে। আমরা যে ঘরে ঢুকেছি তা কেউ ভ্রূক্ষেপই করলো না। কোনোমতে মেঝেতে গুঁজে-সুজে থেবড়ে বসে পড়ে আমিও খেলা দেখতে লাগলাম - কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মুখও literally হাঁ-হয়ে গেলো !! এ কি দেখছি - এ তো ভাই ফুটবল খেলা নয় - এটা একটা আর্ট !! ব্রাজিলের প্রত্যেকটা প্লেয়ার যেন পায়েতে আঠা লাগিয়ে নেমেছে - বল যেন তাদের পা-থেকে বিপক্ষের প্লেয়ারদের কাছে যেতেই চায় না !! অন্যদিকে একই অবস্থা রাশিয়ান গোলকিপারটারও, সেও হাতে যেন আঠা মেখে নেমেছে (পরে তার নাম জেনেছিলাম 'দাসায়েভ') - সে ব্যাটা কিছুতেই গোলে বল ঢুকতে দেবে না !! মাছির মতো উড়ে উড়ে, ড্রাইভ মেরে মেরে ব্রাজিলের যাবতীয় শট আটকে দিচ্ছে। রাশিয়াও মাঝে মাঝেই বেশ ভালো আক্রমণ করছে - একটা পেনাল্টি পেতে গিয়েও পেলো না - এসময় হঠাৎই, দুম করে ব্রাজিলিয়ান গোলকিপার এক হাস্যকর গোল খেয়ে বসলো। ফার্স্ট হাফ শেষে খেলার স্কোর লাইন দাঁড়ালো: রাশিয়া 1, ব্রাজিল 0 - মনটা খারাপ খারাপ লাগছে - কেন তা জানিনা। আমার পছন্দের টিম জিতছে, কিন্তু তবুও ব্রাজিলের জন্যে একটা অদ্ভুত চিনচিনে, মন খারাপ ভাব শুরু হয়ে গেছে - এটাকেই কি বলে ভালোবাসা?

10 মিনিট বাদেই শুরু হলো সেকেন্ড হাফ - বাপরে বাপ, আক্রমন কাকে বলে তা এবারে স্বচক্ষে দেখলাম। জিকো, সক্রেটিস আর ফ্যালকাও-দের একের পর এক আক্রমণে রাশিয়া একেবারে নাজেহাল হয়ে, কোনঠাসা হয়ে পড়লো। শেষ পর্যন্ত পর পর দুটো অসাধারণ গোল দিয়ে ব্রাজিল ম্যাচটা ঠিক বার করে নিলো। ব্রাজিলের দ্বিতীয় গোলটার সময় আমিও যে কেমন উর্দ্ধবাহু হয়ে, তারস্বরে 'গো-ও-ও-ল' বলে চিল্লাতে শুরু করেছি, সেটা দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। 

এর পরে বহুবার নানান বিশ্বকাপে, নানান দেশের খেলা দেখেছি - মারাদোনা, রোসি, গুলিট, জিদান, লিনেকার, বেকহ্যাম, রোনাল্দিনহো, কাকা, ইত্যাদি থেকে হালফিলের ইনিয়েস্তা, রুনি, মেসি, রোনাল্ডো, নেইমার... বহু গোলকিপারও দেখেছি। কিন্তু ব্রাজিল-রাশিয়া ম্যাচের সেই আক্রমনাত্মক টিম গেম, আর রুশ গোলকিপার, 'দাসায়েভের' সেই সব অবিশাস্য গোল-বাঁচানো, এখনো ভুলতে পারিনি। দেখি, এবারের বিশ্বকাপ আমার সেই আক্ষেপ ঘোচাতে পারে কি না...

YouTube Video:  Brazil v USSR (June 14th, 1982 ) <= Click to watch

Thursday, June 5, 2014

একশো টাকার প্রজেক্ট

আর কিছু না চাই, যেন আকাশখানা পাই,
        আর একটা পালিয়ে যাওয়ার মাঠ...

আমাদের ছোটোবেলায় চারিদিকে ছিলো ধূ-ধূ প্রান্তর, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ আর মাঠ। একগাদা খেলার মাঠ তো ছিলোই, এছাড়াও বাড়ির কিছুটা দূরেই ছিল আদিগন্ত ধানক্ষেত, আর আগুনরাঙা ফুলে ভরা কৃষ্ণচূড়া, শিমূল গাছেদের সারি। এক একসময় মনে হতো বিরাট মাঠ-সমুদ্রের মধ্যে কয়েকটা ছোটো ছোটো বাড়ি-ঘর মাথা তুলে কোনোমতে বেঁচে আছে!! গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়া সূর্য্যের আলো গায়ে মাখতে মাখতে বিকেলগুলোতে মাঝে মাঝেই আমি বন্ধুদের সাথে হেঁটে হেঁটে, সবাই মিলে অনেক দূরে চলে যেতাম। একবার একটা সুন্দর মাঠ খুঁজে বার করেছিলাম, অনেকটা সেই রূপকথার গল্পে থাকা 'তেপান্তরের মাঠ'-টার মতোই। মাঠের মাঝে সটান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে, উপরে থাকা অসীম ঘন নীল সেই আকাশের দিকে চেয়ে মন কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠতো। ভাবতাম কোথাও কোনো ভিন নক্ষত্রের গ্রহমন্ডলীতে হয়তো আছে প্রাণ, হয়তো আছে আমাদের মতনই বুদ্ধি-জ্ঞান সম্পন্ন কোনো জীব, যাদের কেউ কেউ হয়তো আমার মতনই এমনি করে কল্পনা করছে যে এই মহাবিশ্বে ওরা নিঃসঙ্গ কিনা। 

বয়সের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, চাহিদা-আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা-নেশা, সব কিছুই বদলে যায়। সেই সুদূর ছোটোবেলায় কেবলই ভাবতাম আর একটু বড়ো হলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো। পালিয়ে যাওয়া ঠিক নয় - নিছক রোমাঞ্চের আশায় বাড়ি ছেড়ে, মাঠ-ঘাট পেরিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবো। বাড়িতে শাসন থাকলেও, সেটা এমন কিছু বাড়াবাড়ি পর্যায়ে ছিলো না।  কিন্তু অতিরিক্ত অ্যাডভেঞ্চার গল্প ও কমিকস বই পড়ার দৌলতে সব সময়ই মনে হতো বাড়ি ছাড়তে না-পারলে এ-জীবনে কিছুই করা হবে না। বাইরের জগৎ মানেই অনেক, অনেক মজা আর স্বাধীনতা - নিয়মের তেমন কোনো বেড়াজাল নেই। কিংবা হয়তো আরও অন্য কিছু ভাবতাম, আজ সেইসব আর মনে পড়েনা, শুধু মনে পড়ে মাঠ ছাড়িয়ে বেড়িয়ে পড়ার সেই অলীক হাতছানিকে। ছোট্ট মাথায় অনেক চিন্তা করে ঠিক করলাম যে মোটামুটি 'একশো' টাকা হলেই বেরিয়ে পড়া যায়।  একশো টাকা ছিলো তখনকার দিনে একটা বিশাল ব্যাপার - কারণ সে'সময় জিনিষপত্রের দাম ছিলো অনেক কম। বিশ পয়সাতেই মিলতো পাঁউরুটি - সিঙারার দাম ছিল দশ পয়সা। মাত্র দুই টাকাতেই বাক্সভর্তি সন্দেশ কেনা যেতো। বাবার সাথে বাজার করতে করতে বেঁচে থাকার জন্যে নূন্যতম জিনিষপত্রগুলোর দাম সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা গড়ে উঠেছিলো। কোথায় থাকবো, বা কি কাজ করে টাকা রোজগার করবো, সেই সব নিয়েও অনেক প্ল্যান করা হয়েছিলো, তবে তার বেশিরভাগটাই এখন আর মনে পড়েনা !! এইরকম করেই সে পরিকল্পনার নানান ফাইন টিউনিং-এর মধ্যে দিয়ে আমার দিনগুলো কেটে যাচ্ছিলো। এমন সময়ে ঘটলো সেই উত্তেজনার ঘটনাটি - যা আমি করবো করবো করেও করে উঠতে পারিনি, সেটাই করে দেখালো আমার এক পিসতুতো দাদা। ক্লাস নাইনে ওঠার পরীক্ষায় পরপর দু'বার ফেল করে, নিজেদের আলমারী থেকে বেশ কিছু টাকা-পয়সা হাতিয়ে, সে বাড়ি ছেড়ে বেমালুম হাওয়া হয়ে গেলো। বাড়ির বড়োদের কপালে চিন্তার ভাঁজের সাথে সাথে আমার মনে আশার আলো বেশ জোরালো হয়ে উঠলো - অ্যাতোদিনে একটা সত্যিকারের রোল মডেল পাওয়া গেছে !! দিন তিন-চার কেটে গেলো - কিন্তু তার পরে ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস হয়ে উঠলো - পুলিশে ফরম্যালী জানানো উচিত হবে কিনা এই নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়ে গেলো। ওদিকে তার মা কেঁদে কেঁদে একেবারে প্রায় পাগল-প্রায় হয়ে উঠলেন। 

তখনকার দিনে মোবাইল ফোন জন্ম নেয়নি - ল্যান্ড ফোনও কারোর বাড়িতে ছিলো না। চিঠি, আর খুব দরকার পড়লে টেলিগ্রাম, এই দুটোই ছিলো যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু মানুষের নিজেদের মধ্যে ভালোবাসার নেটওয়ার্ক ছিলো অনেক জোরদার আর রিলায়েবল। লোকজন একে-অপরের বিপদে স্বেচ্ছায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতো। সেরকমই কে-একজন এক বিকেলে এসে জানালো  যে সেই পিসতুতো দাদাকে নাকি আলিপুরের দিকে কোথায় যেন দেখা গেছে। আবার শুরু হলো নতুন করে খানা-তল্লাশ, জিজ্ঞাসাবাদ। এইবারে সেই দাদার আরেক ক্লোজড ফ্রেন্ডের কাছ থেকে মিললো সম্ভাব্য এক ঠিকানা। পরের দিন সকালেই আমার বাবা সহ বেশ আরো কয়েকজন পাড়ি দিলো সেই অ্যাড্রেস নিয়ে। এর পরের ঘটনাগুলো অনেকটা গতানুগতিক ও হতাশের। বন্ধুর বন্ধু, তস্য বন্ধুর বাড়ি থেকে উবড়ে আনা হলো আমার সেই পিসতুতো দাদাকে। 'চল বাবা - চল বাবা, বাড়ি চল এবার' ইত্যাদি নানান ভালো ভালো কথা বলে তাকে ফিরিয়ে আনা হলো বাড়িতে।  আর ফিরে আসার পরপরেই শুরু হলো তার বাবার বেদম প্রহার - সোজা ভাষায় যাকে বলে 'রাম প্যাঁদানি' - সঙ্গে থাকা অন্যান্যেরা সময়মতো হস্তক্ষেপ না-করলে হয়তো থানা-পুলিশই করতে হতো সে'দিন!! মার খাবার পর তার সেই হতদরিদ্র, ভাঙাচোরা চেহারার খবর শুনে আমার নিজের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হলো - বাড়ি-ছাড়ার প্ল্যানের কিছু রদ-বদল করতে হলো। অত:পর সেই পরিকল্পনাকে ব্যাক-লটে ফেলে রেখে, দূরের সেই মাঠটার ওপারে একটা দো'তলা খাবারের দোকান চালু করার নতুন প্রোজেক্ট শুরু হলো, সঙ্গে জুটে গেলো আমার মতোই স্বপ্নবিলাসী আরেক বন্ধু - মূলধন সেই একশো টাকাই !  কিন্তু সে পরিকল্পনাও খুব বেশী দিন টিকলো না - কারণ খাবারের সম্ভাব্য মেনু নিয়ে আমার ও সেই হবু পার্টনারের মধ্যে ঘোরতর মতবিরোধ দেখা দিলো। এইভাবে নানাবিধ একশো-টাকার পরিকল্পনার স্রোতে ভেসে চললাম আমি - কিন্তু নিষিদ্ধ সেই ফল আর আমার নাগালে এলো না। ধীরে ধীরে কেমন করেই না-জানি মনের নানান পরতের পর পরতের তলায় চাপা পড়ে গেলো 'বাড়ি ছেড়ে হারিয়ে যাবার' সেই অদম্য বাসনা। কঠোর বাস্তবের নাগপাশ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো আমায়। ডাঁয়ে-বাঁয়ে অজস্র লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে সময় যেন কোথা দিয়েই হুশশ করে কেটে গেলো। স্মৃতির সেই পরত পরত লেয়ারগুলো আজ সরিয়ে দেখি পালিয়ে যাবার সেই মাঠখানা এখনও খুঁজে চলেছি আমি... 


Tuesday, May 20, 2014

হাতপাখা থেকে টেবিল ফ্যান থেকে No-ফ্যান...

'উতল হাওয়া' বলতেই টেবিল ফ্যানের কথা মনে এসে যায় - কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি আদৌ টেবিল ফ্যানের হাওয়া খেতেন ? 

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে কোনো ইলেকট্রিক ফ্যান ছিলো না - না সিলিং ফ্যান, না টেবিল ফ্যান। তার বদলে ছিলো একগাদা রং-বেরঙের তালপাতার হাতপাখা - তাদের কোনো কোনটার ধার বরাবর লাল রঙের সিল্কের কাপড় দিয়ে সুন্দর করে সেলাই করা থাকতো, যাতে তালপাতাগুলো সহজে ভেঙ্গে না যায়। বেশিরভাগ হাতপাখার গায়েতে বা হাতলের উপরে আমরা নিজেদের নাম পেন দিয়ে যত্নের সাথে খোদাই করে রাখতাম, যাতে অন্যেরা সহজে দখল করে না নিতে পারে !! হাতপাখাগুলো অবশ্য হাওয়া-খাওয়া ছাড়াও অন্য আরো কয়েকটা কাজে ব্যবহার করা হতো - যেমন পড়া না-পারলে শাস্তি হিসাবে মাথায় বা পিঠে পাখার ডাঁটি দিয়ে সজোরে মারা, কিম্বা কোন নামী-দামী অতিথির ভাত খাবার সময়ে পাখা নাড়িয়ে মাছি তাড়ানো, এরকম কিছু কিছু কাজে। 

বাড়িতে প্রথম টেবিল ফ্যান এসেছিলো এক বিয়ে উপলক্ষ্যে, মাত্র কয়েকদিনের জন্যে ভাড়া করে - তাও আমাদের নিজেদের কোন আত্মীয়ের বিয়ে নয় - যতদূর মনে পড়ে মেজদির এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে। তারা থাকতো এক ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে, অবস্থা ছিলো আমাদের থেকেও খারাপ। তাই আমাদের বাড়িতেই বিয়ের অনুষ্ঠানটা সংক্ষেপে সারানোর অনুমতি চায়। তাদের সে প্রস্তাবে আমাদের বাড়ি থেকে প্রথমে নানান আপত্তি উঠলেও, শেষমেষ সবাই রাজি হয়ে যায়। আমাদের বাড়ি এমন কিছু আহামরি ছিলো না - কিন্তু দোতলা বাড়ি, অনেক কটা ঘর, বিশাল ছাদ আর এক বড়সড় উঠান ছিলো - এছাড়া বাড়ির লাগোয়া বাগান আর পুকুর তো আছেই - যা সবই যেকোনো বিয়েবাড়ির লোভনীয় ফিচারের মধ্যে পড়ে। আমাদের আনন্দের আর সীমা রইলো না - পড়াশুনা সব শিকেয় তুলে আমরা বিয়েবাড়ির আয়োজন নিয়ে মেতে উঠলাম - যেন এ আমাদের নিজেদেরই কোন এক আত্মীয়ের বিয়ে। বিয়ের দিন ক্রমশ: এগিয়ে এলে আস্তে আস্তে আসবাবপত্র ও বিয়ের অন্যান্য জিনিষপত্রদের আসা শুরু হলো। এই ভাবে বিয়ের ঠিক দুদিন আগে এসে গেলো চার-ব্লেডওয়ালা, মাঝারি সাইজের এক টেবিল-ফ্যান। জীবনের প্রথম টেবিল ফ্যানকে হাতে পেয়ে আমাদের সে কি উত্তেজনা ! সুইচ টিপলেই হাওয়া পাওয়া যাচ্ছে, এর থেকেও আরামের আর  কি-ই বা থাকতে পারে ! তার ওপর ফ্যানটা আবার আপনা-আপনিই এদিকে-সেদিকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারিদিকে হাওয়া দিতে পারে। এই সব দেখে আমি আর আমার ছোটদি 'হাঁ' হয়ে গেলাম - পারলে প্রায় সারাক্ষণই টেবিল ফ্যানটার কাছে বসে থাকি আর হাওয়া খেয়ে চলি। বিয়ের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি তাড়াতাড়ি করে সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতলার বারান্দায় ছুটে এলাম, যেখানে ফ্যানটাকে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু আমার আগেই ছোটদিকে দেখলাম সেখানে গিয়ে বসে আছে - দেখেই তো আমার গা-পিত্তি জ্বলতে শুরু করে দিলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলাম ছোটদি তার ডান-হাতের আঙুলগুলো অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরে, মাথা নীচু করে বসে আছে - আর একটা আঙুল দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়েই চলেছে, একই সাথে পাল্লা দিয়ে তার চোখ থেকে টসটস করে জলের দল। বুঝলাম ভুল করে, না-বুঝে সে নিশ্চই চালু থাকা অবস্থায় ফ্যানের কভারের মধ্যে একটা আঙুল ঢুকিয়ে দিয়েছে, আর মুহুর্তের মধ্যে ফ্যানের ব্লেডের আঘাতে সে আঙুল কেটে গেছে। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে থাকার পর সম্বিৎ ফিরে আসতেই আমি হাঁকডাক শুরু করে দিই - মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির বাকিরা সব পড়িমড়ি করে ছুটে এলো। তার পরেই শুরু হলো কম্বাইন্ড ট্রিটমেন্ট - কিছুটা ব্যান্ডেজ-ডেটল দিয়ে, আর বেশিরভাগটাই বাছা-বাছা শব্দ সহ বকুনি দিয়ে। এতক্ষণ ধরে কষ্ট চেপে মুখ বুজে থাকার পর, সম্মিলীত বকুনির বহরে আচমকাই ছোটদি সজোরে কেঁদে উঠলো !!! 
~ * ~ * ~
আজ বহুদিনই হলো দুজনার সংসার থেকে হাতপাখার অস্তিত্ব লোপ পেয়ে গেছে। Cooler আর AC-র দাপটে আজকাল টেবিল ফ্যান তো বটেই, এমনকি সিলিং ফ্যানের ব্যবহারও অনেক, অনেক কমে গিয়েছে। ইনফ্লেশানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আজকাল লোকে গরম পড়তেই পাহাড়ের দিকে বেড়াতে চলে যায় - পুরী, গোপালপুর, মন্দারমণি তো লোকে যখন-তখন গাড়ী করে ঘুরে আসে। 

ছোটদির সাথে বেশ অনেকদিনই হলো আর কথা হয়ে ওঠেনি - ভৌগোলিক দূরত্বের সাথে সাথে মানসিক দূরত্বও অনেকটা বেড়ে গেছে - কিছুটা অজান্তেই। হঠাৎ করে চলে আসা বেয়াড়া সব স্মৃতির দল মাঝে মাঝে সেই পুরানো দিনগুলোর কিছু কিছু ঘটনা আচমকা মনে পড়িয়ে দিয়ে মনকে অযথাই বিষন্নে ভারাতুর করে তোলে...



Sunday, May 11, 2014

অ্যাতো বড়ো আকাশতলে জীবন ক্যানে ছোটো ?

“অ্যাতো বড়ো আকাশতলে জীবন ক্যানে ছোটো ?
          পীরিতি-ফুল মনবৃক্ষে ঝরবে জেনেই ফোটো...”

'তিন প্রজন্ম একসাথে...'  
ছোটবেলায় জামা-কাপড় তো বটেই, এমন কি ছেঁড়া কোনো বইপত্র দেখলে তাকে সযত্নে আঠা দিয়ে মেরামত করে নিজের কাছে রেখে দিতাম - ফেলে দেবার কথা ভাবতেই পারতাম না। সিনেমায় দেখা নায়কদের মতো ইস্পাতকঠিন মানসিকতা গড়ে তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে বাস্তবে দেখা গেলো আমি হয়ে উঠেছি ঠিক তাদের উল্টো !! বেশ আবেগপ্রবণ এবং দুঃখ-কষ্টে যথেষ্ঠ কাতর হয়ে পড়ি। 

এদেশের সিরিয়ালগুলি আমার তেমন দেখা হয়ে ওঠে না। অল্প যে কয়েকটা দেখি তার মধ্যে “স্যুটস” (Suits) হলো একটি। কয়েক সপ্তাহ আগে স্যুটসের 'সিজন ফিনালে'-র শেষ এপিসোডে যখন দেখলাম কাহিনীর মূল দুই চরিত্র, মাইক ও হার্ভি, একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে, লক্ষ্য করলাম সেই একই রকম তীব্র বিষন্নতা, একই রকম মন খারাপ লাগা আবার ফিরে এসেছে। কল্পনার এইসব মানুষগুলো আর সেই একই রকম ভাবে হেসে-খেলে বেড়াবে না, এটা ভেবে নেওয়াটা যেন প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। দীর্ঘদিন ধরে চলা কোন ধারাবাহিক সিরিয়াল শেষ হয়ে গেলে খারাপ লাগাটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু লক্ষ্য করেছি কোন কিছুর পরিবর্তন আমাকে যথেষ্ঠ বিচলিত করে তোলে। আরও দু:খের কথা হলো যে না-চাইলেও পরিবর্তন কিন্তু নিজের নিয়মেই চলে আসে। কিছুদিন আগে আমার এক অফিস-কলিগের রিজাইন করার কথা শুনে সারাটা দিন মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে রইলো, অথচ তার সঙ্গে আমি একসাথে কাজ করেছি মাত্র হাতে-গোনা কয়েকটা দিন মাত্র!!! কেবল দু'দিনের পরিচয়ে একটা মানুষের জন্য মন খারাপ করার মতো ছেলেমানুষি আর কিছু হয় না! কিন্তু নাছোড়বান্দা দুঃখেরা কি হিসেব-নিকেশের মারপ্যাঁচে আটকে পড়তে চায়? সম্পর্ক নিয়ে এইসব উপলব্ধি, এগুলোই ধীরে ধীরে আমাদের বয়স্ক করে তোলে। একটা সময়ের পরে তাই নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হলেও বন্ধুত্ব আর ঠিক গড়ে ওঠে না। মাঝে মাঝে ভাবি সেই সময়টায় কি চলে এলাম নাকি !

গোটা জীবনের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশী সময় কাটিয়েছি মায়ের সাথে, একই বাড়িতে। কিন্তু "মায়ের সাথে কতোটা সময় কাটিয়েছি ?", তা বিশেষ প্রশ্ন বটে !! ক্লাস থ্রী-ফোরে পড়ার সময়ে আমাদের পাড়ার সিনেমাহলে এলো তখনকার দিনের উত্তম-সুপ্রিয়ার হিট ছায়াছবি 'বনপলাশীর পদাবলী' - একান্নবর্তী বিশাল সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম সেরে, আমার মা ও আরো কয়েকজনে মিলে 'ম্যাটিনীর শো'-তে দেখতে গেলেন সেই সিনেমাটি। যাবার মিনিট দশেক বাদেই দেখা গেলো মা বাড়ি ফিরে এসেছেন, প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে। কি ব্যাপার - না একটা সিনেমার টিকিট রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া গেছে, তাই উনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে এসেছেন। ফ্রী-তে সিনেমা দেখার লোভে মায়ের সাথে আমি প্রায় ছুটতে ছুটতে গিয়ে হাজির হলাম সিনেমাহলে। কিন্তু ঢুকতে গিয়ে বেশ ঝামেলা হলো - জানা গেলো যে ওটা সেই দিনের টিকিট হলেও, ওটা ছিলো Noon শোয়ের টিকিট!! মায়ের উপর প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে, রেগেমেগে একা একা বাড়ি ফিরে এলাম - কিন্তু মা যে কতো আগ্রহ করে, কতো কষ্টে, দ্রুত হেঁটে আমাকে নিয়ে যেতে এসেছিলেন, তা সেই “তখনকার আমি” ভেবেও দ্যাখেনি !!

বছর পেরিয়ে গেলো অনেকদিনই - মা'র সঙ্গে দেখা হয়না। কতদিন বেঁচে থাকবো আর আমি? মা-ই বা আর কতদিন বাঁচবেন? কতবার যাওয়া হবে দেশে ততদিনে? কতদিন থাকবো মায়ের কাছে? প্রতিদিন কতঘন্টা করে মায়ের পাশে বসে থাকা হবে? এই জীবনে যদি সব হিসেব একশোভাগও মিলে যায়, যদি কোন বিপর্যয় না হয়, যদি কোন ব্যতিক্রম না হয়, তাহলে মায়ের পাশে বসে থাকা হবে ঠিক কতো ঘন্টা? কী অদ্ভুত যে মানুষের জীবন !!

সবকিছুই বদলায়, সবকিছুই দূরে সরে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় সম্প্রসারণশীল এই মহাবিশ্বের কারণেই যেন আমরা সবাই সবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমন প্রতিটা সরে যাওয়াই কষ্ট নিয়ে আসে আমার জন্য, নিশ্চুপ বসে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা। নৈর্ব্যক্তিকভাবে চিন্তা করলে, প্রতিটা সম্পর্কই শুরু হওয়া মাত্রই সেটার জন্য কষ্ট পাওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। সম্পর্কগুলি যেন অনেকটা টাইমারের মতো। কোন সম্পর্কের শুরু মানেই যেন কেউ সেই টাইমারটা চালু করে দেয়। তারপর যতো আনন্দই, বা যতো প্রাপ্তিই আসুক না কেন, সেই সম্পর্কের থেকে নির্ধারিত কষ্টটুকু নিশ্চিতভাবেই আমাদের ফিরে পেতে হবে। ভাবি, সে জন্যেই কি গৌতম বুদ্ধ স্বেচ্ছায় গৃহত্যাগী হয়েছিলেন? 

সুখেদের শরীরে মালিন্যের আস্তরণ জমে উঠে, ক্ষয়ে ক্ষয়ে একসময় তারা একেবারেই উধাও হয়ে যায়। দুঃখরাই কেবল শুধু ঝাড়বংশে বেড়ে চলতেই থাকে - দুঃখরাই থেকে যায় আমাদের সারা জীবনভ'রে। 'বন পলাশীর পদাবলী'-তে উদাস বাউল মনের দু:খে গান গেয়ে উঠেছিলো: “অ্যাতো বড়ো আকাশতলে জীবন ক্যানে ছোটো ?” - এটাই মনে হয় সবচেয়ে খাঁটি কথা। যতবারই কারও কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় ভেবেছি, এদের সাথে আর হয়তো কখনো দেখা হবে না, মনটা অজান্তেই হু-হু করে কেঁদে উঠেছে। এমন নয় যে এদের আমি প্রতিদিন দেখি - কিন্তু চাইলেই যে আর এদের ফিরে পাওয়া যাবে না, এই অনুভূতিটা খুব কষ্টের। 

দিনে দিনে বুঝেছি মানুষের জীবন আসলেই হলো এক ধূমকেতুর মতো, সব কিছুই ক্ষণিকের দেখা, ক্ষণিকের পাওয়া। সম্পর্কের টাইমারেরা প্রতিমুহূর্তে টিক-টিক করে বেজেই চলেছে আমাদের চারপাশে। জানি কোন লাভ নেই, এই কষ্টের সবটুকুই অনতিক্রম্য নিয়তি। এই দুঃখ, এই বিষণ্ণতা, এই শূন্যতাই শুধু শ্বাশত সত্য - “ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে...”

Saturday, April 19, 2014

ফুল ফুটুক না-ফুটুক আজ বসন্ত...

কিশোর বয়সের কোন এক বন্ধুর কাছে প্রথম শুনেছিলাম যে 'প্রেম করলে প্রচুর হাঁটতে হয়' - যুক্তি হিসাবে সে বলেছিলো যে প্রেমিকাকে কারণে-অকারণে সারপ্রাইজ দিতে হলে চাই পকেটভর্তি টাকা, যা দিয়ে কথায় কথায় বাদাম-ঝালমুড়ি, আলুকাবলি-ফুচকা, রোল-ক্যাডবেরীর সাথে সাথে গচ্চা দিয়ে গোচ্ছা গোচ্ছা (রক্তবর্ণ) গোলাপ ফুল কিনে দিতে হবে - সে তার জন্মদিন আসুক, বা না-আসুক !! তা, অ্যাতো পয়সা আসবে কোথা থেকে? বাড়ি থেকে পাওয়া পকেটমানি দিয়ে তো বাবা অ্যা-ত্তো সব কুলোবে না। অগত্যা যেখানে পারবে সেখান থেকে পয়সা বাঁচাবে - সুযোগ পেলেই বাসে-ট্রামে না-চড়ে স্রেফ হাঁটবে - তাতে শরীরের ব্যায়ামও হবে, প্লাস প্রেমিকাকে মন-ভোলানো কথা বলার রিহার্সালটুকুরও সময় হয়ে যাবে।

তা, সে'সময়ে আমি প্রচুর হেঁটেছি - not necessarily for উপরে বর্ণিত কারণে - বরং রেকর্ডের কারণে। Wait !! হাঁটার রেকর্ড করার জন্যে নয় ! বরং সেকেন্ডহ্যান্ড, পুরানো গানের রেকর্ড খুঁজে খুঁজে স্বস্তায় কেনার জন্যে - mostly 'HMV', 'মেগাফোন' আর 'ইনরেকো' থেকে বার হওয়া আগেকার দিনের বাংলা আধুনিক গানের রেকর্ডের জন্যে। সেন্ট্রাল কলকাতার ধর্মতলার মোড় থেকে ওয়েলিংটন স্কোয়ার, অর্থাৎ 'রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার' হয়ে 'কলেজ স্ট্রীট' পর্যন্ত রাস্তাটা হলো একটা বিশাল 'L'-এর মতো। আমি বহুবার পয়সা বাঁচাতে, বাসে না-উঠে স্রেফ পায়ে হেঁটে ধর্মতলার মোড় থেকে কলেজ স্ট্রীট চলে আসতাম - তারপর সারা বইপাড়া চক্কর মেরে মহাত্মা গান্ধী রোড ধরে সোজা শিয়ালদাহ স্টেশনে এসে বিনা-টিকিটে সাউথের ট্রেন ধরতাম। তা সেই ওয়েলিংটন স্কোয়ার রাস্তার দু'পাশে সে-সময় প্রচুর পুরানো রেকর্ডের দোকান ছিলো। তাদের কাছে প্রায় যে-কোন ধরনের বাংলা, হিন্দী, এমনকি ওয়েস্টার্ন অর্কেস্ট্রা, রক, পপ, ইনস্ট্রুমেন্টালের বিশাল কালেকশন থাকতো। কলেজ স্ট্রীটের বইয়ের দোকানগুলোর মতোই এদের নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্ক ছিলো দেখার মতো। কোনো রেকর্ড নিজের কাছে না-থাকলে সেটা আর কার কার কাছে থাকতে পারে, তা এরা চোখ বুজে, এক মূহুর্তে বলে দিতে পারতো। "Georgy Girl" সিনেমার বহুখ্যাত Georgy Girl গানটা যে Seekers নামে এক অস্ট্রেলিয়ান, ফোক বেসড মিউজিক্যাল গ্রুপ সৃষ্টি করেছিলো, তা প্রথম জেনেছিলাম ফুটো হয়ে যাওয়া, হাতকাটা গেঞ্জি পরে বসে থাকা এক বয়স্ক দোকানদারের কাছ থেকে। ছোপ কাটা, সস্তা চায়ের কাপে চুক-চুক করে চুমুক দিতে দিতে তিনি বলে চলেছিলেন ওই রেকর্ডের আর কোন কোন গানগুলো তাঁর ভালো লাগে। সে ছিলো এক সম্পূর্ণ অন্য জগৎ - আজকালকার অনলাইন পাইরেসি আর গুগল সার্চের জগতে যা কল্পনা করাও অবান্তর।

সেই একই ওয়েলিংটন স্কোয়ার রাস্তা ধরে লাস্ট বার কলকাতায় গিয়ে অনেকটা হেঁটেছিলাম - কোনো রেকর্ড কেনার বাসনা ছিলো না - সঙ্গে হেঁটে যাবার মতো কোনো প্রেমিকাও পাশে ছিলো না - স্রেফ হাঁটার জন্যেই হেঁটেছিলাম - বেশ কয়েক ঘন্টা ধরেই। কিন্তু কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই, সত্যজিৎ রায়ের 'সোনার কেল্লা' ছায়াছবির সেই জয়সলমীরের ভাঙা-চোরা কেল্লার পথে দাঁড়ায়ে পড়া ছোট্ট মুকুলের মতোই দু'চোখ জলে ভর্তি হয়ে, গলা অবরুদ্ধ হয়ে, চাপা কান্না নেমে এসেছিলো। দোকানগুলো বেশিরভাগই আজ আর নেই - যেগুলো কোনওভাবে টিকে আছে তাদের চেহারা আরও খারাপের দিকে। অধিকাংশ দোকানেরই তাক ভর্তি থাক-থাক সস্তা MP3 আর কিছু ক্যাসেটের ঢল। রেকর্ড যা-কিছু আছে তা কোনমতে, সংকোচে মুখ নিচু করে দোকানের এক কোনে পড়ে রয়েছে - কেউ ভুলেও আর তাদের খোঁজ করেনা - অনেকটা বৃদ্ধাশ্রমে পড়ে থাকা অসহায়, ভগ্নপ্রায় পূর্বপুরুষদের মতো। আবারও মনে চলে এলো হারিয়ে যাওয়া আরেক বন্ধুর কথা: "Being 'Alone' is different from being 'Lonely'. One is by choice - other one is plain sad fate..."

শ্রদ্ধেয় সুভাষদা (কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়) মিছেই বলে গেছেন 'ফুল ফুটুক না-ফুটুক আজ বসন্ত...'


Sunday, April 13, 2014

তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে - শুভ নববর্ষ ১৪২১

ভাই, যতোই বলুন না কেন, 'শুভ নববর্ষ' বলার থেকে 'হ্যাপি নিউ ইয়ার' বললে নিজেকে বেশ অনেকটাই মডার্ন আর স্মার্ট দেখায় - তাই না? সত্যি করে বলুন - বিলিতী ইংরেজী ভাষায় কথা বলার মধ্যে বেশ একটা 'ইয়ে, ইয়ে' ব্যাপার আছে। খামোকা সেন্টিমেন্টাল না হয়ে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে হবে। সেই 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' সিনেমার উৎপল দত্তের কথা মনে করে দেখুন - তাই বলছি, একগাদা ফালতু, বস্তাপচা, সেকেলে সেন্টু খেয়ে কোন লাভ আছে? আপনিই বলুন।

আমার কিন্তু চোখ বুজলে এখনও বেশ মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখের দিনে, বেশ ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়তাম। বাবার কড়া আদেশ ছিলো, অন্তত ওইদিন বেশিক্ষণ ঘুমানো চলবে না। বাড়ির উঠানে জড়ো করা থাকতো কিছু ভেজা খড়-বিচুলি আর শুকনো ঘাস-পাতা। সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতো - গল গল করে সাদা-কালো বিচিত্র গন্ধ-বর্ণ মাখা সেই ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে যেতো উপরে, আরও উপরে। আমরা ঘুম ঘুম চোখে সবাই, সেই ধোঁয়া-ভরা জায়গাটা একে একে যজ্ঞস্থান মনে করে গোল করে তিনবার প্রদক্ষিণ করতাম। তারপর ধোঁয়ার মাঝ দিয়ে এক লাফ মেরে সেই ধোঁয়া-কুণ্ডলীকে অতিক্রম করতাম। পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বাবা গম্ভীর গলায়, প্রায় মন্ত্র উচ্চারণের স্বরে বলে উঠতেন: “বিগত বছরের যাবতীয় শোক-দুঃখ, ভুল-ত্রুটি, ব্যথা-যন্ত্রণা, পাপ-কুকর্ম, সব ধুয়ে মুছে যাক - নতুন বছর আমাদের সকলের জন্য নিয়ে আসুক অফুরন্ত হাসি-আনন্দ-সৌভাগ্য, উৎসাহ উদ্দীপনা, চির-সবুজ সতেজতা” - রেডিওতে শোনা যেতো সেই চির-চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত: 'এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...'। বেলা গড়ালে নিমপাতা আর কাঁচা হলুদ বাটা, সর্ষে তেল দিয়ে সারা গায়ে-মুখে ডলে ডলে, ভালো করে মেখে পুকুরে সাঁতার কেটে খুব করে স্নান করতাম। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে নাম-না-জানা কতো লোক একের পর এক এসে হাজির হতো, শুভ নববর্ষ জানাতে। কেউ কেউ আবার গল্প-গুজবের ফাঁকে দিব্যি থেকে যেতো, দুপুরের খাবার খেয়ে তবে যেতো। মা মহা সমারোহে তৈরী করতেন দুপুরের খাবারের জন্যে নানান রকমের পদ। খেতে বসতে বসতে প্রায় বেলা দেড়টা বেজে যেতো। একসাথে সবাই মিলে বসে তুমূল চেঁচামিচি আর হৈ-হল্লার মধ্য দিয়ে আমরা শুরু করতাম ভুরিভোজন - শুক্তো দিয়ে হতো শুরু, আর শেষ হতো চাটনি-দৈ-মিষ্টি দিয়ে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসলে বাবার হাত ধরে গুটিগুটি বেড়িয়ে পড়তাম ধারে-কাছের নানান দোকানে হালখাতার নিমন্ত্রণ রাখতে। 'গনেশের মুদিখানা', 'ললিত বস্ত্রালয়', 'কান্ত মিত্রের সোনার দোকান',আরও অনেকগুলো দোকান - সবক'টার নাম এখন আর মনেও আসে না। লাল-নীল গার্ডার দিয়ে গোল করে বাঁধা একখানা কালেন্ডার, আর এক বাক্স মিস্টি সব দোকান থেকেই পাওয়া যেতো - কিন্তু বরফ দেওয়া ঠান্ডা লস্যি বা বোতল ভর্তি কোকাকোলা দিতো শুধু সোনার দোকানগুলোতেই। তাই ওই সব দোকানগুলোতেই যেতাম আগে আগে। প্রচুর ভীড় ঠেলে ঠেলে, সেই মিস্টির বাক্স আর ক্যালেন্ডারগুলোকে সাবধানে দোমড়ানো-মোচড়ানোর হাত থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে বাড়ি ফেরা, কোন যুদ্ধ জয়ের থেকে কম কিছু ছিলো না। সাদা রংয়ের মিষ্টির বাক্সগুলো ভর্তি থাকতো বোঁদে/সীতাভোগ, মিহিদানা, পান্তুয়া আর ল্যাংচা দিয়ে। সারা বছরে হাতে-গোনা যে কয়েকবার বাড়িতে লুচি, আলুর-দম রান্না হতো, পয়লা বৈশাখের রাত ছিলো তাদের মধ্যে একটি। গরম গরম লুচি-আলুর দম শেষ করবার পরে, সেই মিষ্টিগুলো খেতে যে কি অস্বাভাবিক ভালো লাগতো, তা হয়তো ঠিক লিখে বোঝানো যাবে না। খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকলে কোন ঘরের দেওয়ালে কোন ক্যালেন্ডার টাঙাবো, তা ঠিক করতে করতেই রাত কাবার হয়ে যেতো।

আর এখন?
পয়লা বৈশাখের দিনে, সকাল সাড়ে-সাতটায় MP3-রুপী চৌরাশিয়ার বাঁশি হাই-ফাই মিউজিক সিস্টেমে সুরের মূর্ছণা ছড়ালে পাশের ঘর থেকে হুমকি শোনা যায়: “ম্যা-ন, হোয়াট আর ইয়ু ডু-ইং !! মা গো, আর কতোকাল এ-যন্ত্রণা সইতে হবে !! এই ভোরবেলা টুকুতেই যা-এট্টু ঘুমোই আমি !!!” - অগত্যা চৌরাশিয়াকে বাঁশি-হারা করে, চোরের মতোই প্রায় নি:শব্দে চা-তৈরী করে ল্যাপটপে ব্রাউসিংয়ের মধ্য দিয়ে হারানো পয়লা বৈশাখের স্মৃতি হাঁতড়ে বেড়াই। বেলা গড়ালে নিদান আসে: “বলি শুনছো? সল্টলেকের 'কট-এন্ড-বোল্ড', কিম্বা 'সিক্সথ বালিগঞ্জ প্লেস'-এ বুকিংটা আগে থেকেই করে দাও। মেনুতে 'ডাব-চিংড়ি'-টা আছে কিনা ভালো করে শিওর হয়ে নিও, তাহলে দারুন জমে যাবে - বু-ঝে-ছো? ছোটপিসি আর রাঙাকাকুদের ওখানেই মিট করতে বলে দেবো - সোজা চলে আসবে নববর্ষ করতে। আবার হাঁদার মতো যেন বাংলাতে জিজ্ঞাসা কোরে বোসোনা - বোলো, 'প্রনস কুক্ড ইন টেন্ডার কোকোনাট ক্রিম'...” - আমি খান-কতক ঢোঁক গিলে, খাবি খেয়ে শুনে যাই খালি, আর মনে মনে ভাবি - হায়রে বাঙালী ! দেখ, আসলি হাঁড়ির হাল কাকে বলে ! - যাই হোক, 'শুভ নববর্ষ ১৪২১' ....


Wednesday, March 26, 2014

মন যতোদূর চাইছে যেতে ঠিক ততোদূর আমার দেশ...


এই ভোরবেলা অবধিও মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে চলেছিলো - সেই বৃষ্টিতে গাছপালা, লতাপাতা, পাখির গা', আর ঘরের চাল ধুয়ে-মুছে সব চকচক করে উঠেছে। বিকেলের বৃষ্টি যেমন মন-খারাপের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি সকালের বৃষ্টি বুকভরা এক নাম-না-জানা আনন্দ বয়ে আনে। বৃষ্টির জলে স্নান করে জবা, কুমড়ো ফুল আর ধানের সবুজ পাতাগুলো, সোনালী রোদে চিকচিকে হাসি খেলছে। মৃদুমন্দ বাতাসে ঋষি-মুনিদের মত ধানের শিসগুলো এদিক-ওদিক মাথা দুলিয়ে চলেছে। ভারতের এই অংশটি পূর্ব সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম। আধুনিকতার ছোঁয়া মানুষের পায়ে পায়ে চলে আসলেও জীবন চলার পথে তার ছাপ এখনো সুস্পষ্ট নয়। তাই সোঁদা মাটির ঘ্রাণ এখনও এখানে পাওয়া যায় - সুনীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শান্তির নি:শ্বাস নেওয়া যায় - ইলশে-গুঁড়ি বৃষ্টিতে প্রকৃতির ভালবাসাকে বুকে আপন করে টেনে নেওয়া যায়। কুটনৈতিক টানাপোড়ন, রাজনীতির বিভীষিকা কিংবা ধর্মীয় বিভেদ এখনো এখানকার মানুষে-মানুষে বিভেদ জোগাতে পারেনি। জীবন চলে এখানে শান্ত, নির্বিকার ভঙ্গীতে - এক নিজস্ব ছন্দে...



ফরচুন কুকি

লাঞ্চে গিয়েছিলাম খেতে Milpitas-এর এক পপুলার চাইনীজ রেঁস্তরাতে, 'Chili Palace'-এ। শুক্রবারের দুপুরে মারাত্মক ভীড় - টিম লাঞ্চ বলে একসাথে বড়ো টেবিল পাওয়াও বেশ মুস্কিল। প্রায় আধঘন্টা দাঁড়ানোর পর মিললো আমাদের খাবার জায়গা - দুটো টেবিল জোড়া লাগিয়ে একসাথে বসার ব্যবস্থা হলো। চুটিয়ে খাওয়া-দাওয়ার পর এলো সেই মজার মুহূর্তটি - অর্থাৎ 'ফরচুন কুকি' ভাঙার পালা। টিম লাঞ্চে নব্য চালু করা ত্যাঁদড়ামো-রীতি অনুযায়ী আমাদের প্রত্যেককে তাদের ফরচুন কুকি ভেঙ্গে, সেটার মধ্যে থাকা কাগজে কি মেসেজ লেখা আছে তা জোরে জোরে পড়তে হবে। সব থেকে হাস্যকর এবং অভিনব মেসেজ যে পাবে, তার খাবারের দামের শেয়ার, অন্যেরা শেয়ার করে নেবে !! ভোটাভুটিতে সবথেকে মজার মেসেজটিকে নির্বাচন করা হবে - এবং এক্ষেত্রে আমাদের ম্যানেজার, 'শ্রীনিবাসন'-এর ভুমিকা পালন করার গুরুদায়িত্বটি নেবেন। আমার ভাগ্যে যথারীতি সে রকম ভালো কিছু কখনো হয় না - এবারেও হলো না। কিন্তু আমার ফরচুন কুকি-র মেসেজটা পড়ে আমার নিজেরই বেশ মজা লাগলো - 'Must talk to a forgotten friend to get invaluable advise that may change course of your life...' -এরকম intrigued ধরণের একখানা মেসেজ। এমনিতে অবশ্য আমার বন্ধুদের সংখ্যা খুব বেশী নয় - তার উপরে মুখচোরা বলে অনেকেই আমাকে আন-সোশ্যাল এবং কম-জ্ঞানী বলে সম্মান দিয়ে থাকে। তাই সেরকম ভাবে ধরতে গেলে আমার প্রায় টু-থার্ড বন্ধুরাই দিব্যি চলে আসবে 'ফরগটন' লিস্টে !! কিন্তু ফরচুন কুকি বলে কথা - তাছাড়া জীবনের এই মধ্য পর্যায়ে এসে মাগনা অ্যাডভাইসে জীবনের কোর্স বদলানো মুখের কথা নয়। লোকে কতো পয়সা খরচ করে, লাইফ চেঞ্জের উদ্দেশ্যে shrink-এর কাছে যায় - আর আমি তো প্রায় ফ্রী-তেই বদলানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছি !! তাই অফিসে ফিরেই ডেস্কে বসে একদম পুরানো দিনের ইমেলগুলোতে চোখ বোলাতে লাগলাম। কোন মহাজ্ঞানী যেন বলে গিয়েছিলেন, “যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন...” - তো, কে বলতে পারে, আজই হয়তো আমার সেই 'হারানো রতন' পাবার দিন !! বিস্তর চিন্তা-ভাবনার পর অবশেষে সিলেক্ট করলাম প্রবাস জীবনের শুরুতেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া এক বিচ্ছু ক্লাসমেটের নাম! একসময় সবার পিছনে লেগে লেগে সে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো - কিন্তু গানের গলাটি ছিলো তার বেশ ভালো। ওই একটা কারণেই তার যাবতীয় বাঁদরামো কিছুটা মুখ বুজে সহ্য করে এসেছিলাম। গলায়-গলায় বন্ধুত্ব না-হলেও, মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য একটা রিলেশান কেমন করে না-জানি গড়ে উঠেছিলো। শেষ কথাবার্তা হয়েছিলো প্রায় বছর-বারো আগে - অর্থাৎ এক যুগ পেরিয়ে গেছে আমাদের নিশ্চুপতার পালা !!

ফেসবুক-এ সার্চ করে তার পাত্তা যোগাড় করতে খুব বেশী সময় লাগলো না - ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট-এর জবাব পেতে লাগলো আরো ঘন্টা দুয়েক !! তার মিনিট দশেকের মধ্যে আমার সেল ফোনে পিড়িং পিড়িং টোনে ভেসে এলো তার গা-জ্বলানো কন্ঠস্বর: “কি রে হতচ্ছাড়া, বেঁচে আছিস এখনো?” - এরপর চললো অনর্গল, অবান্তর, লাগামহীন কথাবার্তা - অনেকটা আনাড়ি চাইনিজদের পিং-পং খেলার ঢংয়েই !! স্কুল-জীবন হয়ে কলেজ জীবন, বান্ধবী থেকে বৌ, ইন্ডিয়ান রাজনীতি ঘুরে ক্রিকেট, শ্রীনিবাসন থেকে সাউথ সিটি, ছেলে-পিলে, বাবা-মা, সুগার-কোলেস্টেরল - আরো যত্তসব হাবিজাবি কথার পর হঠাৎই খেয়াল হলো: আরে!! সে ব্যাটা কোথায় থাকে আর কি কাজ করে, সেই দরকারী কথাটাই তো জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠেনি !! তাই প্রশ্ন করলাম, “এখন কোথায় আছিস আর কি কাজ করছিস ?” - তার দেওয়া উত্তরে প্রায় ২২০ ভোল্টেজের কারেন্ট শক খেয়ে চমকে উঠলাম - জানলাম গত দেড়বছর ধরে সে আর আমি একই কোম্পানিতে কাজ করে চলেছি - ITতেই !!! সে এখন আছে অ্যামেরিকার-ই East Coast-এর দিকে - কিন্তু যে অ্যান্ড্রয়েড-প্রজেক্টে সে কাজ করছে তার সব কিছুই কন্ট্রোল হয় এখান থেকে - অর্থাৎআমার ফ্লোরের অন্যদিকে থাকা এক প্রজেক্ট টিমের দ্বারা !! সুতরাং রেসিডেন্সিয়াল ডিস্ট্যানসটুকু বাদ দিলে সে আর আমি এক ফ্লোরেই কাজ করে যাচ্ছি। সে আছে ফোর্থ ফ্লোরের নর্থ-এর দিকে, আর আমি সাউথের দিকে - লে হালুয়া !!! TGIF (Thank God It Was Friday)....


Friday, March 21, 2014

পরবেশ আলী...

নারিকেল-সুপারি-কাঁঠাল-জামরুল গাছে ঘেরা এক ঘন বাগান ছিলো আমাদের একসময়। আমার ছোটবেলার প্রচুর সময় কেটে গেছিলো সেই বাগানে, বেশিরভাগ সময়ই একা-একা খেলতে। বাগানের গাছের ডাব-সুপারি-ডাঁটা-কাঁঠাল-ইত্যাদি পাড়া, পাতা-কাটা, জঞ্জাল সাফ করা থেকে যাবতীয় কাজ করে দিতো 'পরবেশ আলী' নামে এক বিশ্বাসী মুসলমান। আসতো সে লক্ষীকান্তপুরের এক অজ পাড়া-গাঁ থেকে - আমরা ডাকতাম তাকে 'পরবেশদা' বলে। মা ঠাট্টা করে বলতেন, ও হলো গিয়ে 'শুনে-মোল্লা' - অর্থাৎ দেশভাগের পরে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সময়ে ওকে জোর করে, প্রাণের হুমকি দিয়ে মুসলমান হতে বাধ্য করা হয়েছিলো। বাড়ির যে-কোন অনুষ্ঠান বা পরিশ্রমের কাজে পরবেশদা এক কথায় রাজি হয়ে যেতো। কোনো মজুরি তাকে সাধারনত: দেওয়া হতো না, বিনিময়ে সে কিছুটা কমদামে গাছের ডাব-নারকেল-সুপারি আমাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে, বাজারে বেশী দামে বিক্রি করতো - এটাই যা ছিলো তার লাভ। শীতকালের দিকে বাগানের কোন উঁচু  গাছে ঘুড়ি আটকে পড়লে, আমি ভোর-সকালে ঘুম থেকে উঠে পরবেশদার আসার জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতাম - কখন সে এসে, গাছে চড়ে সেই ঘুড়িটা আমায় নামিয়ে দেবে !! লম্বা যে-কোন নারকেল গাছের একেবারে মাথায় উঠে যেতে তার লাগতো দু' থেকে তিন মিনিট - কিন্তু সেই দু-তিন মিনিট সময়ই যেন মনে হতো কয়েক ঘন্টা !! নিচে দাঁড়িয়ে থেকে, মাথা সোজা উপরের দিকে তুলে আমি কড়া নজর রেখে চলতাম যে ঘুড়িটার কোন ক্ষতি যেন সে না-করে ফেলে - কিন্তু তার নিজের কষ্টের কথা কখনো মাথাতেই আসে নি। একবার সে পাড়ার অন্য এক লোকের বাগানের নারকেল গাছ থেকে নামতে গিয়ে, গাছের প্রায় মাঝমাঝি থেকে পা-স্লিপ করে, সোজা নীচে পড়ে গিয়ে বেশ ভালোমতো জখম হয়ে যায় !! আমাদের বাড়ি থেকেই তার সুশ্রুষার সব খরচ দেওয়া হয়। অস্বাভাবিক প্রাণশক্তির কল্যাণে সে মাস খানেকের মধ্যেই আবার সুস্থ হয়ে ওঠে। 

আজ আমাদের সেই বাগান ও গাছপালা তাদের জীবনের প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে - পরবেশ আলীরও অনেক বয়স হযে গেছে। আগের মতো অতো দ্রুত সে গাছে চড়তে পারে না। অনিয়মিত হলেও, সে তবু আসে আমাদের বাড়িতে - বাগানের খুচ-খাচ কাজ করে দিয়ে যায়, আগের মতোই যত্ন করে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের বাগান, গাছপালা, আর বাবা-মাকে, আমাদের চেয়েও সে  চিরটাকালই অনেক, অনেক বেশি ভালবেসেছিলো...