Tuesday, May 20, 2014

হাতপাখা থেকে টেবিল ফ্যান থেকে No-ফ্যান...

'উতল হাওয়া' বলতেই টেবিল ফ্যানের কথা মনে এসে যায় - কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কি আদৌ টেবিল ফ্যানের হাওয়া খেতেন ? 

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে কোনো ইলেকট্রিক ফ্যান ছিলো না - না সিলিং ফ্যান, না টেবিল ফ্যান। তার বদলে ছিলো একগাদা রং-বেরঙের তালপাতার হাতপাখা - তাদের কোনো কোনটার ধার বরাবর লাল রঙের সিল্কের কাপড় দিয়ে সুন্দর করে সেলাই করা থাকতো, যাতে তালপাতাগুলো সহজে ভেঙ্গে না যায়। বেশিরভাগ হাতপাখার গায়েতে বা হাতলের উপরে আমরা নিজেদের নাম পেন দিয়ে যত্নের সাথে খোদাই করে রাখতাম, যাতে অন্যেরা সহজে দখল করে না নিতে পারে !! হাতপাখাগুলো অবশ্য হাওয়া-খাওয়া ছাড়াও অন্য আরো কয়েকটা কাজে ব্যবহার করা হতো - যেমন পড়া না-পারলে শাস্তি হিসাবে মাথায় বা পিঠে পাখার ডাঁটি দিয়ে সজোরে মারা, কিম্বা কোন নামী-দামী অতিথির ভাত খাবার সময়ে পাখা নাড়িয়ে মাছি তাড়ানো, এরকম কিছু কিছু কাজে। 

বাড়িতে প্রথম টেবিল ফ্যান এসেছিলো এক বিয়ে উপলক্ষ্যে, মাত্র কয়েকদিনের জন্যে ভাড়া করে - তাও আমাদের নিজেদের কোন আত্মীয়ের বিয়ে নয় - যতদূর মনে পড়ে মেজদির এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে। তারা থাকতো এক ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে, অবস্থা ছিলো আমাদের থেকেও খারাপ। তাই আমাদের বাড়িতেই বিয়ের অনুষ্ঠানটা সংক্ষেপে সারানোর অনুমতি চায়। তাদের সে প্রস্তাবে আমাদের বাড়ি থেকে প্রথমে নানান আপত্তি উঠলেও, শেষমেষ সবাই রাজি হয়ে যায়। আমাদের বাড়ি এমন কিছু আহামরি ছিলো না - কিন্তু দোতলা বাড়ি, অনেক কটা ঘর, বিশাল ছাদ আর এক বড়সড় উঠান ছিলো - এছাড়া বাড়ির লাগোয়া বাগান আর পুকুর তো আছেই - যা সবই যেকোনো বিয়েবাড়ির লোভনীয় ফিচারের মধ্যে পড়ে। আমাদের আনন্দের আর সীমা রইলো না - পড়াশুনা সব শিকেয় তুলে আমরা বিয়েবাড়ির আয়োজন নিয়ে মেতে উঠলাম - যেন এ আমাদের নিজেদেরই কোন এক আত্মীয়ের বিয়ে। বিয়ের দিন ক্রমশ: এগিয়ে এলে আস্তে আস্তে আসবাবপত্র ও বিয়ের অন্যান্য জিনিষপত্রদের আসা শুরু হলো। এই ভাবে বিয়ের ঠিক দুদিন আগে এসে গেলো চার-ব্লেডওয়ালা, মাঝারি সাইজের এক টেবিল-ফ্যান। জীবনের প্রথম টেবিল ফ্যানকে হাতে পেয়ে আমাদের সে কি উত্তেজনা ! সুইচ টিপলেই হাওয়া পাওয়া যাচ্ছে, এর থেকেও আরামের আর  কি-ই বা থাকতে পারে ! তার ওপর ফ্যানটা আবার আপনা-আপনিই এদিকে-সেদিকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারিদিকে হাওয়া দিতে পারে। এই সব দেখে আমি আর আমার ছোটদি 'হাঁ' হয়ে গেলাম - পারলে প্রায় সারাক্ষণই টেবিল ফ্যানটার কাছে বসে থাকি আর হাওয়া খেয়ে চলি। বিয়ের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি তাড়াতাড়ি করে সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতলার বারান্দায় ছুটে এলাম, যেখানে ফ্যানটাকে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু আমার আগেই ছোটদিকে দেখলাম সেখানে গিয়ে বসে আছে - দেখেই তো আমার গা-পিত্তি জ্বলতে শুরু করে দিলো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলাম ছোটদি তার ডান-হাতের আঙুলগুলো অন্য হাত দিয়ে চেপে ধরে, মাথা নীচু করে বসে আছে - আর একটা আঙুল দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়েই চলেছে, একই সাথে পাল্লা দিয়ে তার চোখ থেকে টসটস করে জলের দল। বুঝলাম ভুল করে, না-বুঝে সে নিশ্চই চালু থাকা অবস্থায় ফ্যানের কভারের মধ্যে একটা আঙুল ঢুকিয়ে দিয়েছে, আর মুহুর্তের মধ্যে ফ্যানের ব্লেডের আঘাতে সে আঙুল কেটে গেছে। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে থাকার পর সম্বিৎ ফিরে আসতেই আমি হাঁকডাক শুরু করে দিই - মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির বাকিরা সব পড়িমড়ি করে ছুটে এলো। তার পরেই শুরু হলো কম্বাইন্ড ট্রিটমেন্ট - কিছুটা ব্যান্ডেজ-ডেটল দিয়ে, আর বেশিরভাগটাই বাছা-বাছা শব্দ সহ বকুনি দিয়ে। এতক্ষণ ধরে কষ্ট চেপে মুখ বুজে থাকার পর, সম্মিলীত বকুনির বহরে আচমকাই ছোটদি সজোরে কেঁদে উঠলো !!! 
~ * ~ * ~
আজ বহুদিনই হলো দুজনার সংসার থেকে হাতপাখার অস্তিত্ব লোপ পেয়ে গেছে। Cooler আর AC-র দাপটে আজকাল টেবিল ফ্যান তো বটেই, এমনকি সিলিং ফ্যানের ব্যবহারও অনেক, অনেক কমে গিয়েছে। ইনফ্লেশানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আজকাল লোকে গরম পড়তেই পাহাড়ের দিকে বেড়াতে চলে যায় - পুরী, গোপালপুর, মন্দারমণি তো লোকে যখন-তখন গাড়ী করে ঘুরে আসে। 

ছোটদির সাথে বেশ অনেকদিনই হলো আর কথা হয়ে ওঠেনি - ভৌগোলিক দূরত্বের সাথে সাথে মানসিক দূরত্বও অনেকটা বেড়ে গেছে - কিছুটা অজান্তেই। হঠাৎ করে চলে আসা বেয়াড়া সব স্মৃতির দল মাঝে মাঝে সেই পুরানো দিনগুলোর কিছু কিছু ঘটনা আচমকা মনে পড়িয়ে দিয়ে মনকে অযথাই বিষন্নে ভারাতুর করে তোলে...



Sunday, May 11, 2014

অ্যাতো বড়ো আকাশতলে জীবন ক্যানে ছোটো ?

“অ্যাতো বড়ো আকাশতলে জীবন ক্যানে ছোটো ?
          পীরিতি-ফুল মনবৃক্ষে ঝরবে জেনেই ফোটো...”

'তিন প্রজন্ম একসাথে...'  
ছোটবেলায় জামা-কাপড় তো বটেই, এমন কি ছেঁড়া কোনো বইপত্র দেখলে তাকে সযত্নে আঠা দিয়ে মেরামত করে নিজের কাছে রেখে দিতাম - ফেলে দেবার কথা ভাবতেই পারতাম না। সিনেমায় দেখা নায়কদের মতো ইস্পাতকঠিন মানসিকতা গড়ে তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে বাস্তবে দেখা গেলো আমি হয়ে উঠেছি ঠিক তাদের উল্টো !! বেশ আবেগপ্রবণ এবং দুঃখ-কষ্টে যথেষ্ঠ কাতর হয়ে পড়ি। 

এদেশের সিরিয়ালগুলি আমার তেমন দেখা হয়ে ওঠে না। অল্প যে কয়েকটা দেখি তার মধ্যে “স্যুটস” (Suits) হলো একটি। কয়েক সপ্তাহ আগে স্যুটসের 'সিজন ফিনালে'-র শেষ এপিসোডে যখন দেখলাম কাহিনীর মূল দুই চরিত্র, মাইক ও হার্ভি, একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে, লক্ষ্য করলাম সেই একই রকম তীব্র বিষন্নতা, একই রকম মন খারাপ লাগা আবার ফিরে এসেছে। কল্পনার এইসব মানুষগুলো আর সেই একই রকম ভাবে হেসে-খেলে বেড়াবে না, এটা ভেবে নেওয়াটা যেন প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। দীর্ঘদিন ধরে চলা কোন ধারাবাহিক সিরিয়াল শেষ হয়ে গেলে খারাপ লাগাটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু লক্ষ্য করেছি কোন কিছুর পরিবর্তন আমাকে যথেষ্ঠ বিচলিত করে তোলে। আরও দু:খের কথা হলো যে না-চাইলেও পরিবর্তন কিন্তু নিজের নিয়মেই চলে আসে। কিছুদিন আগে আমার এক অফিস-কলিগের রিজাইন করার কথা শুনে সারাটা দিন মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে রইলো, অথচ তার সঙ্গে আমি একসাথে কাজ করেছি মাত্র হাতে-গোনা কয়েকটা দিন মাত্র!!! কেবল দু'দিনের পরিচয়ে একটা মানুষের জন্য মন খারাপ করার মতো ছেলেমানুষি আর কিছু হয় না! কিন্তু নাছোড়বান্দা দুঃখেরা কি হিসেব-নিকেশের মারপ্যাঁচে আটকে পড়তে চায়? সম্পর্ক নিয়ে এইসব উপলব্ধি, এগুলোই ধীরে ধীরে আমাদের বয়স্ক করে তোলে। একটা সময়ের পরে তাই নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হলেও বন্ধুত্ব আর ঠিক গড়ে ওঠে না। মাঝে মাঝে ভাবি সেই সময়টায় কি চলে এলাম নাকি !

গোটা জীবনের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশী সময় কাটিয়েছি মায়ের সাথে, একই বাড়িতে। কিন্তু "মায়ের সাথে কতোটা সময় কাটিয়েছি ?", তা বিশেষ প্রশ্ন বটে !! ক্লাস থ্রী-ফোরে পড়ার সময়ে আমাদের পাড়ার সিনেমাহলে এলো তখনকার দিনের উত্তম-সুপ্রিয়ার হিট ছায়াছবি 'বনপলাশীর পদাবলী' - একান্নবর্তী বিশাল সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম সেরে, আমার মা ও আরো কয়েকজনে মিলে 'ম্যাটিনীর শো'-তে দেখতে গেলেন সেই সিনেমাটি। যাবার মিনিট দশেক বাদেই দেখা গেলো মা বাড়ি ফিরে এসেছেন, প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে। কি ব্যাপার - না একটা সিনেমার টিকিট রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া গেছে, তাই উনি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে এসেছেন। ফ্রী-তে সিনেমা দেখার লোভে মায়ের সাথে আমি প্রায় ছুটতে ছুটতে গিয়ে হাজির হলাম সিনেমাহলে। কিন্তু ঢুকতে গিয়ে বেশ ঝামেলা হলো - জানা গেলো যে ওটা সেই দিনের টিকিট হলেও, ওটা ছিলো Noon শোয়ের টিকিট!! মায়ের উপর প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে, রেগেমেগে একা একা বাড়ি ফিরে এলাম - কিন্তু মা যে কতো আগ্রহ করে, কতো কষ্টে, দ্রুত হেঁটে আমাকে নিয়ে যেতে এসেছিলেন, তা সেই “তখনকার আমি” ভেবেও দ্যাখেনি !!

বছর পেরিয়ে গেলো অনেকদিনই - মা'র সঙ্গে দেখা হয়না। কতদিন বেঁচে থাকবো আর আমি? মা-ই বা আর কতদিন বাঁচবেন? কতবার যাওয়া হবে দেশে ততদিনে? কতদিন থাকবো মায়ের কাছে? প্রতিদিন কতঘন্টা করে মায়ের পাশে বসে থাকা হবে? এই জীবনে যদি সব হিসেব একশোভাগও মিলে যায়, যদি কোন বিপর্যয় না হয়, যদি কোন ব্যতিক্রম না হয়, তাহলে মায়ের পাশে বসে থাকা হবে ঠিক কতো ঘন্টা? কী অদ্ভুত যে মানুষের জীবন !!

সবকিছুই বদলায়, সবকিছুই দূরে সরে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় সম্প্রসারণশীল এই মহাবিশ্বের কারণেই যেন আমরা সবাই সবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমন প্রতিটা সরে যাওয়াই কষ্ট নিয়ে আসে আমার জন্য, নিশ্চুপ বসে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা। নৈর্ব্যক্তিকভাবে চিন্তা করলে, প্রতিটা সম্পর্কই শুরু হওয়া মাত্রই সেটার জন্য কষ্ট পাওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। সম্পর্কগুলি যেন অনেকটা টাইমারের মতো। কোন সম্পর্কের শুরু মানেই যেন কেউ সেই টাইমারটা চালু করে দেয়। তারপর যতো আনন্দই, বা যতো প্রাপ্তিই আসুক না কেন, সেই সম্পর্কের থেকে নির্ধারিত কষ্টটুকু নিশ্চিতভাবেই আমাদের ফিরে পেতে হবে। ভাবি, সে জন্যেই কি গৌতম বুদ্ধ স্বেচ্ছায় গৃহত্যাগী হয়েছিলেন? 

সুখেদের শরীরে মালিন্যের আস্তরণ জমে উঠে, ক্ষয়ে ক্ষয়ে একসময় তারা একেবারেই উধাও হয়ে যায়। দুঃখরাই কেবল শুধু ঝাড়বংশে বেড়ে চলতেই থাকে - দুঃখরাই থেকে যায় আমাদের সারা জীবনভ'রে। 'বন পলাশীর পদাবলী'-তে উদাস বাউল মনের দু:খে গান গেয়ে উঠেছিলো: “অ্যাতো বড়ো আকাশতলে জীবন ক্যানে ছোটো ?” - এটাই মনে হয় সবচেয়ে খাঁটি কথা। যতবারই কারও কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় ভেবেছি, এদের সাথে আর হয়তো কখনো দেখা হবে না, মনটা অজান্তেই হু-হু করে কেঁদে উঠেছে। এমন নয় যে এদের আমি প্রতিদিন দেখি - কিন্তু চাইলেই যে আর এদের ফিরে পাওয়া যাবে না, এই অনুভূতিটা খুব কষ্টের। 

দিনে দিনে বুঝেছি মানুষের জীবন আসলেই হলো এক ধূমকেতুর মতো, সব কিছুই ক্ষণিকের দেখা, ক্ষণিকের পাওয়া। সম্পর্কের টাইমারেরা প্রতিমুহূর্তে টিক-টিক করে বেজেই চলেছে আমাদের চারপাশে। জানি কোন লাভ নেই, এই কষ্টের সবটুকুই অনতিক্রম্য নিয়তি। এই দুঃখ, এই বিষণ্ণতা, এই শূন্যতাই শুধু শ্বাশত সত্য - “ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে...”

Saturday, April 19, 2014

ফুল ফুটুক না-ফুটুক আজ বসন্ত...

কিশোর বয়সের কোন এক বন্ধুর কাছে প্রথম শুনেছিলাম যে 'প্রেম করলে প্রচুর হাঁটতে হয়' - যুক্তি হিসাবে সে বলেছিলো যে প্রেমিকাকে কারণে-অকারণে সারপ্রাইজ দিতে হলে চাই পকেটভর্তি টাকা, যা দিয়ে কথায় কথায় বাদাম-ঝালমুড়ি, আলুকাবলি-ফুচকা, রোল-ক্যাডবেরীর সাথে সাথে গচ্চা দিয়ে গোচ্ছা গোচ্ছা (রক্তবর্ণ) গোলাপ ফুল কিনে দিতে হবে - সে তার জন্মদিন আসুক, বা না-আসুক !! তা, অ্যাতো পয়সা আসবে কোথা থেকে? বাড়ি থেকে পাওয়া পকেটমানি দিয়ে তো বাবা অ্যা-ত্তো সব কুলোবে না। অগত্যা যেখানে পারবে সেখান থেকে পয়সা বাঁচাবে - সুযোগ পেলেই বাসে-ট্রামে না-চড়ে স্রেফ হাঁটবে - তাতে শরীরের ব্যায়ামও হবে, প্লাস প্রেমিকাকে মন-ভোলানো কথা বলার রিহার্সালটুকুরও সময় হয়ে যাবে।

তা, সে'সময়ে আমি প্রচুর হেঁটেছি - not necessarily for উপরে বর্ণিত কারণে - বরং রেকর্ডের কারণে। Wait !! হাঁটার রেকর্ড করার জন্যে নয় ! বরং সেকেন্ডহ্যান্ড, পুরানো গানের রেকর্ড খুঁজে খুঁজে স্বস্তায় কেনার জন্যে - mostly 'HMV', 'মেগাফোন' আর 'ইনরেকো' থেকে বার হওয়া আগেকার দিনের বাংলা আধুনিক গানের রেকর্ডের জন্যে। সেন্ট্রাল কলকাতার ধর্মতলার মোড় থেকে ওয়েলিংটন স্কোয়ার, অর্থাৎ 'রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার' হয়ে 'কলেজ স্ট্রীট' পর্যন্ত রাস্তাটা হলো একটা বিশাল 'L'-এর মতো। আমি বহুবার পয়সা বাঁচাতে, বাসে না-উঠে স্রেফ পায়ে হেঁটে ধর্মতলার মোড় থেকে কলেজ স্ট্রীট চলে আসতাম - তারপর সারা বইপাড়া চক্কর মেরে মহাত্মা গান্ধী রোড ধরে সোজা শিয়ালদাহ স্টেশনে এসে বিনা-টিকিটে সাউথের ট্রেন ধরতাম। তা সেই ওয়েলিংটন স্কোয়ার রাস্তার দু'পাশে সে-সময় প্রচুর পুরানো রেকর্ডের দোকান ছিলো। তাদের কাছে প্রায় যে-কোন ধরনের বাংলা, হিন্দী, এমনকি ওয়েস্টার্ন অর্কেস্ট্রা, রক, পপ, ইনস্ট্রুমেন্টালের বিশাল কালেকশন থাকতো। কলেজ স্ট্রীটের বইয়ের দোকানগুলোর মতোই এদের নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্ক ছিলো দেখার মতো। কোনো রেকর্ড নিজের কাছে না-থাকলে সেটা আর কার কার কাছে থাকতে পারে, তা এরা চোখ বুজে, এক মূহুর্তে বলে দিতে পারতো। "Georgy Girl" সিনেমার বহুখ্যাত Georgy Girl গানটা যে Seekers নামে এক অস্ট্রেলিয়ান, ফোক বেসড মিউজিক্যাল গ্রুপ সৃষ্টি করেছিলো, তা প্রথম জেনেছিলাম ফুটো হয়ে যাওয়া, হাতকাটা গেঞ্জি পরে বসে থাকা এক বয়স্ক দোকানদারের কাছ থেকে। ছোপ কাটা, সস্তা চায়ের কাপে চুক-চুক করে চুমুক দিতে দিতে তিনি বলে চলেছিলেন ওই রেকর্ডের আর কোন কোন গানগুলো তাঁর ভালো লাগে। সে ছিলো এক সম্পূর্ণ অন্য জগৎ - আজকালকার অনলাইন পাইরেসি আর গুগল সার্চের জগতে যা কল্পনা করাও অবান্তর।

সেই একই ওয়েলিংটন স্কোয়ার রাস্তা ধরে লাস্ট বার কলকাতায় গিয়ে অনেকটা হেঁটেছিলাম - কোনো রেকর্ড কেনার বাসনা ছিলো না - সঙ্গে হেঁটে যাবার মতো কোনো প্রেমিকাও পাশে ছিলো না - স্রেফ হাঁটার জন্যেই হেঁটেছিলাম - বেশ কয়েক ঘন্টা ধরেই। কিন্তু কিছুক্ষণ হাঁটার পরেই, সত্যজিৎ রায়ের 'সোনার কেল্লা' ছায়াছবির সেই জয়সলমীরের ভাঙা-চোরা কেল্লার পথে দাঁড়ায়ে পড়া ছোট্ট মুকুলের মতোই দু'চোখ জলে ভর্তি হয়ে, গলা অবরুদ্ধ হয়ে, চাপা কান্না নেমে এসেছিলো। দোকানগুলো বেশিরভাগই আজ আর নেই - যেগুলো কোনওভাবে টিকে আছে তাদের চেহারা আরও খারাপের দিকে। অধিকাংশ দোকানেরই তাক ভর্তি থাক-থাক সস্তা MP3 আর কিছু ক্যাসেটের ঢল। রেকর্ড যা-কিছু আছে তা কোনমতে, সংকোচে মুখ নিচু করে দোকানের এক কোনে পড়ে রয়েছে - কেউ ভুলেও আর তাদের খোঁজ করেনা - অনেকটা বৃদ্ধাশ্রমে পড়ে থাকা অসহায়, ভগ্নপ্রায় পূর্বপুরুষদের মতো। আবারও মনে চলে এলো হারিয়ে যাওয়া আরেক বন্ধুর কথা: "Being 'Alone' is different from being 'Lonely'. One is by choice - other one is plain sad fate..."

শ্রদ্ধেয় সুভাষদা (কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়) মিছেই বলে গেছেন 'ফুল ফুটুক না-ফুটুক আজ বসন্ত...'


Sunday, April 13, 2014

তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে - শুভ নববর্ষ ১৪২১

ভাই, যতোই বলুন না কেন, 'শুভ নববর্ষ' বলার থেকে 'হ্যাপি নিউ ইয়ার' বললে নিজেকে বেশ অনেকটাই মডার্ন আর স্মার্ট দেখায় - তাই না? সত্যি করে বলুন - বিলিতী ইংরেজী ভাষায় কথা বলার মধ্যে বেশ একটা 'ইয়ে, ইয়ে' ব্যাপার আছে। খামোকা সেন্টিমেন্টাল না হয়ে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে হবে। সেই 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ' সিনেমার উৎপল দত্তের কথা মনে করে দেখুন - তাই বলছি, একগাদা ফালতু, বস্তাপচা, সেকেলে সেন্টু খেয়ে কোন লাভ আছে? আপনিই বলুন।

আমার কিন্তু চোখ বুজলে এখনও বেশ মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখের দিনে, বেশ ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়তাম। বাবার কড়া আদেশ ছিলো, অন্তত ওইদিন বেশিক্ষণ ঘুমানো চলবে না। বাড়ির উঠানে জড়ো করা থাকতো কিছু ভেজা খড়-বিচুলি আর শুকনো ঘাস-পাতা। সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতো - গল গল করে সাদা-কালো বিচিত্র গন্ধ-বর্ণ মাখা সেই ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ে যেতো উপরে, আরও উপরে। আমরা ঘুম ঘুম চোখে সবাই, সেই ধোঁয়া-ভরা জায়গাটা একে একে যজ্ঞস্থান মনে করে গোল করে তিনবার প্রদক্ষিণ করতাম। তারপর ধোঁয়ার মাঝ দিয়ে এক লাফ মেরে সেই ধোঁয়া-কুণ্ডলীকে অতিক্রম করতাম। পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বাবা গম্ভীর গলায়, প্রায় মন্ত্র উচ্চারণের স্বরে বলে উঠতেন: “বিগত বছরের যাবতীয় শোক-দুঃখ, ভুল-ত্রুটি, ব্যথা-যন্ত্রণা, পাপ-কুকর্ম, সব ধুয়ে মুছে যাক - নতুন বছর আমাদের সকলের জন্য নিয়ে আসুক অফুরন্ত হাসি-আনন্দ-সৌভাগ্য, উৎসাহ উদ্দীপনা, চির-সবুজ সতেজতা” - রেডিওতে শোনা যেতো সেই চির-চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত: 'এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...'। বেলা গড়ালে নিমপাতা আর কাঁচা হলুদ বাটা, সর্ষে তেল দিয়ে সারা গায়ে-মুখে ডলে ডলে, ভালো করে মেখে পুকুরে সাঁতার কেটে খুব করে স্নান করতাম। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে নাম-না-জানা কতো লোক একের পর এক এসে হাজির হতো, শুভ নববর্ষ জানাতে। কেউ কেউ আবার গল্প-গুজবের ফাঁকে দিব্যি থেকে যেতো, দুপুরের খাবার খেয়ে তবে যেতো। মা মহা সমারোহে তৈরী করতেন দুপুরের খাবারের জন্যে নানান রকমের পদ। খেতে বসতে বসতে প্রায় বেলা দেড়টা বেজে যেতো। একসাথে সবাই মিলে বসে তুমূল চেঁচামিচি আর হৈ-হল্লার মধ্য দিয়ে আমরা শুরু করতাম ভুরিভোজন - শুক্তো দিয়ে হতো শুরু, আর শেষ হতো চাটনি-দৈ-মিষ্টি দিয়ে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসলে বাবার হাত ধরে গুটিগুটি বেড়িয়ে পড়তাম ধারে-কাছের নানান দোকানে হালখাতার নিমন্ত্রণ রাখতে। 'গনেশের মুদিখানা', 'ললিত বস্ত্রালয়', 'কান্ত মিত্রের সোনার দোকান',আরও অনেকগুলো দোকান - সবক'টার নাম এখন আর মনেও আসে না। লাল-নীল গার্ডার দিয়ে গোল করে বাঁধা একখানা কালেন্ডার, আর এক বাক্স মিস্টি সব দোকান থেকেই পাওয়া যেতো - কিন্তু বরফ দেওয়া ঠান্ডা লস্যি বা বোতল ভর্তি কোকাকোলা দিতো শুধু সোনার দোকানগুলোতেই। তাই ওই সব দোকানগুলোতেই যেতাম আগে আগে। প্রচুর ভীড় ঠেলে ঠেলে, সেই মিস্টির বাক্স আর ক্যালেন্ডারগুলোকে সাবধানে দোমড়ানো-মোচড়ানোর হাত থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে বাড়ি ফেরা, কোন যুদ্ধ জয়ের থেকে কম কিছু ছিলো না। সাদা রংয়ের মিষ্টির বাক্সগুলো ভর্তি থাকতো বোঁদে/সীতাভোগ, মিহিদানা, পান্তুয়া আর ল্যাংচা দিয়ে। সারা বছরে হাতে-গোনা যে কয়েকবার বাড়িতে লুচি, আলুর-দম রান্না হতো, পয়লা বৈশাখের রাত ছিলো তাদের মধ্যে একটি। গরম গরম লুচি-আলুর দম শেষ করবার পরে, সেই মিষ্টিগুলো খেতে যে কি অস্বাভাবিক ভালো লাগতো, তা হয়তো ঠিক লিখে বোঝানো যাবে না। খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকলে কোন ঘরের দেওয়ালে কোন ক্যালেন্ডার টাঙাবো, তা ঠিক করতে করতেই রাত কাবার হয়ে যেতো।

আর এখন?
পয়লা বৈশাখের দিনে, সকাল সাড়ে-সাতটায় MP3-রুপী চৌরাশিয়ার বাঁশি হাই-ফাই মিউজিক সিস্টেমে সুরের মূর্ছণা ছড়ালে পাশের ঘর থেকে হুমকি শোনা যায়: “ম্যা-ন, হোয়াট আর ইয়ু ডু-ইং !! মা গো, আর কতোকাল এ-যন্ত্রণা সইতে হবে !! এই ভোরবেলা টুকুতেই যা-এট্টু ঘুমোই আমি !!!” - অগত্যা চৌরাশিয়াকে বাঁশি-হারা করে, চোরের মতোই প্রায় নি:শব্দে চা-তৈরী করে ল্যাপটপে ব্রাউসিংয়ের মধ্য দিয়ে হারানো পয়লা বৈশাখের স্মৃতি হাঁতড়ে বেড়াই। বেলা গড়ালে নিদান আসে: “বলি শুনছো? সল্টলেকের 'কট-এন্ড-বোল্ড', কিম্বা 'সিক্সথ বালিগঞ্জ প্লেস'-এ বুকিংটা আগে থেকেই করে দাও। মেনুতে 'ডাব-চিংড়ি'-টা আছে কিনা ভালো করে শিওর হয়ে নিও, তাহলে দারুন জমে যাবে - বু-ঝে-ছো? ছোটপিসি আর রাঙাকাকুদের ওখানেই মিট করতে বলে দেবো - সোজা চলে আসবে নববর্ষ করতে। আবার হাঁদার মতো যেন বাংলাতে জিজ্ঞাসা কোরে বোসোনা - বোলো, 'প্রনস কুক্ড ইন টেন্ডার কোকোনাট ক্রিম'...” - আমি খান-কতক ঢোঁক গিলে, খাবি খেয়ে শুনে যাই খালি, আর মনে মনে ভাবি - হায়রে বাঙালী ! দেখ, আসলি হাঁড়ির হাল কাকে বলে ! - যাই হোক, 'শুভ নববর্ষ ১৪২১' ....


Wednesday, March 26, 2014

মন যতোদূর চাইছে যেতে ঠিক ততোদূর আমার দেশ...


এই ভোরবেলা অবধিও মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে চলেছিলো - সেই বৃষ্টিতে গাছপালা, লতাপাতা, পাখির গা', আর ঘরের চাল ধুয়ে-মুছে সব চকচক করে উঠেছে। বিকেলের বৃষ্টি যেমন মন-খারাপের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি সকালের বৃষ্টি বুকভরা এক নাম-না-জানা আনন্দ বয়ে আনে। বৃষ্টির জলে স্নান করে জবা, কুমড়ো ফুল আর ধানের সবুজ পাতাগুলো, সোনালী রোদে চিকচিকে হাসি খেলছে। মৃদুমন্দ বাতাসে ঋষি-মুনিদের মত ধানের শিসগুলো এদিক-ওদিক মাথা দুলিয়ে চলেছে। ভারতের এই অংশটি পূর্ব সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম। আধুনিকতার ছোঁয়া মানুষের পায়ে পায়ে চলে আসলেও জীবন চলার পথে তার ছাপ এখনো সুস্পষ্ট নয়। তাই সোঁদা মাটির ঘ্রাণ এখনও এখানে পাওয়া যায় - সুনীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শান্তির নি:শ্বাস নেওয়া যায় - ইলশে-গুঁড়ি বৃষ্টিতে প্রকৃতির ভালবাসাকে বুকে আপন করে টেনে নেওয়া যায়। কুটনৈতিক টানাপোড়ন, রাজনীতির বিভীষিকা কিংবা ধর্মীয় বিভেদ এখনো এখানকার মানুষে-মানুষে বিভেদ জোগাতে পারেনি। জীবন চলে এখানে শান্ত, নির্বিকার ভঙ্গীতে - এক নিজস্ব ছন্দে...



ফরচুন কুকি

লাঞ্চে গিয়েছিলাম খেতে Milpitas-এর এক পপুলার চাইনীজ রেঁস্তরাতে, 'Chili Palace'-এ। শুক্রবারের দুপুরে মারাত্মক ভীড় - টিম লাঞ্চ বলে একসাথে বড়ো টেবিল পাওয়াও বেশ মুস্কিল। প্রায় আধঘন্টা দাঁড়ানোর পর মিললো আমাদের খাবার জায়গা - দুটো টেবিল জোড়া লাগিয়ে একসাথে বসার ব্যবস্থা হলো। চুটিয়ে খাওয়া-দাওয়ার পর এলো সেই মজার মুহূর্তটি - অর্থাৎ 'ফরচুন কুকি' ভাঙার পালা। টিম লাঞ্চে নব্য চালু করা ত্যাঁদড়ামো-রীতি অনুযায়ী আমাদের প্রত্যেককে তাদের ফরচুন কুকি ভেঙ্গে, সেটার মধ্যে থাকা কাগজে কি মেসেজ লেখা আছে তা জোরে জোরে পড়তে হবে। সব থেকে হাস্যকর এবং অভিনব মেসেজ যে পাবে, তার খাবারের দামের শেয়ার, অন্যেরা শেয়ার করে নেবে !! ভোটাভুটিতে সবথেকে মজার মেসেজটিকে নির্বাচন করা হবে - এবং এক্ষেত্রে আমাদের ম্যানেজার, 'শ্রীনিবাসন'-এর ভুমিকা পালন করার গুরুদায়িত্বটি নেবেন। আমার ভাগ্যে যথারীতি সে রকম ভালো কিছু কখনো হয় না - এবারেও হলো না। কিন্তু আমার ফরচুন কুকি-র মেসেজটা পড়ে আমার নিজেরই বেশ মজা লাগলো - 'Must talk to a forgotten friend to get invaluable advise that may change course of your life...' -এরকম intrigued ধরণের একখানা মেসেজ। এমনিতে অবশ্য আমার বন্ধুদের সংখ্যা খুব বেশী নয় - তার উপরে মুখচোরা বলে অনেকেই আমাকে আন-সোশ্যাল এবং কম-জ্ঞানী বলে সম্মান দিয়ে থাকে। তাই সেরকম ভাবে ধরতে গেলে আমার প্রায় টু-থার্ড বন্ধুরাই দিব্যি চলে আসবে 'ফরগটন' লিস্টে !! কিন্তু ফরচুন কুকি বলে কথা - তাছাড়া জীবনের এই মধ্য পর্যায়ে এসে মাগনা অ্যাডভাইসে জীবনের কোর্স বদলানো মুখের কথা নয়। লোকে কতো পয়সা খরচ করে, লাইফ চেঞ্জের উদ্দেশ্যে shrink-এর কাছে যায় - আর আমি তো প্রায় ফ্রী-তেই বদলানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছি !! তাই অফিসে ফিরেই ডেস্কে বসে একদম পুরানো দিনের ইমেলগুলোতে চোখ বোলাতে লাগলাম। কোন মহাজ্ঞানী যেন বলে গিয়েছিলেন, “যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন...” - তো, কে বলতে পারে, আজই হয়তো আমার সেই 'হারানো রতন' পাবার দিন !! বিস্তর চিন্তা-ভাবনার পর অবশেষে সিলেক্ট করলাম প্রবাস জীবনের শুরুতেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়া এক বিচ্ছু ক্লাসমেটের নাম! একসময় সবার পিছনে লেগে লেগে সে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো - কিন্তু গানের গলাটি ছিলো তার বেশ ভালো। ওই একটা কারণেই তার যাবতীয় বাঁদরামো কিছুটা মুখ বুজে সহ্য করে এসেছিলাম। গলায়-গলায় বন্ধুত্ব না-হলেও, মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য একটা রিলেশান কেমন করে না-জানি গড়ে উঠেছিলো। শেষ কথাবার্তা হয়েছিলো প্রায় বছর-বারো আগে - অর্থাৎ এক যুগ পেরিয়ে গেছে আমাদের নিশ্চুপতার পালা !!

ফেসবুক-এ সার্চ করে তার পাত্তা যোগাড় করতে খুব বেশী সময় লাগলো না - ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট-এর জবাব পেতে লাগলো আরো ঘন্টা দুয়েক !! তার মিনিট দশেকের মধ্যে আমার সেল ফোনে পিড়িং পিড়িং টোনে ভেসে এলো তার গা-জ্বলানো কন্ঠস্বর: “কি রে হতচ্ছাড়া, বেঁচে আছিস এখনো?” - এরপর চললো অনর্গল, অবান্তর, লাগামহীন কথাবার্তা - অনেকটা আনাড়ি চাইনিজদের পিং-পং খেলার ঢংয়েই !! স্কুল-জীবন হয়ে কলেজ জীবন, বান্ধবী থেকে বৌ, ইন্ডিয়ান রাজনীতি ঘুরে ক্রিকেট, শ্রীনিবাসন থেকে সাউথ সিটি, ছেলে-পিলে, বাবা-মা, সুগার-কোলেস্টেরল - আরো যত্তসব হাবিজাবি কথার পর হঠাৎই খেয়াল হলো: আরে!! সে ব্যাটা কোথায় থাকে আর কি কাজ করে, সেই দরকারী কথাটাই তো জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠেনি !! তাই প্রশ্ন করলাম, “এখন কোথায় আছিস আর কি কাজ করছিস ?” - তার দেওয়া উত্তরে প্রায় ২২০ ভোল্টেজের কারেন্ট শক খেয়ে চমকে উঠলাম - জানলাম গত দেড়বছর ধরে সে আর আমি একই কোম্পানিতে কাজ করে চলেছি - ITতেই !!! সে এখন আছে অ্যামেরিকার-ই East Coast-এর দিকে - কিন্তু যে অ্যান্ড্রয়েড-প্রজেক্টে সে কাজ করছে তার সব কিছুই কন্ট্রোল হয় এখান থেকে - অর্থাৎআমার ফ্লোরের অন্যদিকে থাকা এক প্রজেক্ট টিমের দ্বারা !! সুতরাং রেসিডেন্সিয়াল ডিস্ট্যানসটুকু বাদ দিলে সে আর আমি এক ফ্লোরেই কাজ করে যাচ্ছি। সে আছে ফোর্থ ফ্লোরের নর্থ-এর দিকে, আর আমি সাউথের দিকে - লে হালুয়া !!! TGIF (Thank God It Was Friday)....


Friday, March 21, 2014

পরবেশ আলী...

নারিকেল-সুপারি-কাঁঠাল-জামরুল গাছে ঘেরা এক ঘন বাগান ছিলো আমাদের একসময়। আমার ছোটবেলার প্রচুর সময় কেটে গেছিলো সেই বাগানে, বেশিরভাগ সময়ই একা-একা খেলতে। বাগানের গাছের ডাব-সুপারি-ডাঁটা-কাঁঠাল-ইত্যাদি পাড়া, পাতা-কাটা, জঞ্জাল সাফ করা থেকে যাবতীয় কাজ করে দিতো 'পরবেশ আলী' নামে এক বিশ্বাসী মুসলমান। আসতো সে লক্ষীকান্তপুরের এক অজ পাড়া-গাঁ থেকে - আমরা ডাকতাম তাকে 'পরবেশদা' বলে। মা ঠাট্টা করে বলতেন, ও হলো গিয়ে 'শুনে-মোল্লা' - অর্থাৎ দেশভাগের পরে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সময়ে ওকে জোর করে, প্রাণের হুমকি দিয়ে মুসলমান হতে বাধ্য করা হয়েছিলো। বাড়ির যে-কোন অনুষ্ঠান বা পরিশ্রমের কাজে পরবেশদা এক কথায় রাজি হয়ে যেতো। কোনো মজুরি তাকে সাধারনত: দেওয়া হতো না, বিনিময়ে সে কিছুটা কমদামে গাছের ডাব-নারকেল-সুপারি আমাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে, বাজারে বেশী দামে বিক্রি করতো - এটাই যা ছিলো তার লাভ। শীতকালের দিকে বাগানের কোন উঁচু  গাছে ঘুড়ি আটকে পড়লে, আমি ভোর-সকালে ঘুম থেকে উঠে পরবেশদার আসার জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতাম - কখন সে এসে, গাছে চড়ে সেই ঘুড়িটা আমায় নামিয়ে দেবে !! লম্বা যে-কোন নারকেল গাছের একেবারে মাথায় উঠে যেতে তার লাগতো দু' থেকে তিন মিনিট - কিন্তু সেই দু-তিন মিনিট সময়ই যেন মনে হতো কয়েক ঘন্টা !! নিচে দাঁড়িয়ে থেকে, মাথা সোজা উপরের দিকে তুলে আমি কড়া নজর রেখে চলতাম যে ঘুড়িটার কোন ক্ষতি যেন সে না-করে ফেলে - কিন্তু তার নিজের কষ্টের কথা কখনো মাথাতেই আসে নি। একবার সে পাড়ার অন্য এক লোকের বাগানের নারকেল গাছ থেকে নামতে গিয়ে, গাছের প্রায় মাঝমাঝি থেকে পা-স্লিপ করে, সোজা নীচে পড়ে গিয়ে বেশ ভালোমতো জখম হয়ে যায় !! আমাদের বাড়ি থেকেই তার সুশ্রুষার সব খরচ দেওয়া হয়। অস্বাভাবিক প্রাণশক্তির কল্যাণে সে মাস খানেকের মধ্যেই আবার সুস্থ হয়ে ওঠে। 

আজ আমাদের সেই বাগান ও গাছপালা তাদের জীবনের প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে - পরবেশ আলীরও অনেক বয়স হযে গেছে। আগের মতো অতো দ্রুত সে গাছে চড়তে পারে না। অনিয়মিত হলেও, সে তবু আসে আমাদের বাড়িতে - বাগানের খুচ-খাচ কাজ করে দিয়ে যায়, আগের মতোই যত্ন করে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের বাগান, গাছপালা, আর বাবা-মাকে, আমাদের চেয়েও সে  চিরটাকালই অনেক, অনেক বেশি ভালবেসেছিলো...

Saturday, March 8, 2014

আমজনতা


'আমজনতা' শব্দটার অর্থ প্রায় সবারই জানা - কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কথাটার উৎপত্তি হলো কি করে। অনেকেই বলবে উর্দুতে 'আম' মানে হলো গিয়ে 'সাধারণ' - কিন্তু উর্দুতেই বা 'আম' কথাটা এলো কি করে? আমগাছের 'আম' থেকে? যদি তাই হয়, তা'হলে আম কি একসময় এতোটাই সস্তা আর সুলভ ছিলো যে জনসাধারণ সবাই-ই আম খেতে পেতো? বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় - অন্তত: ইদানিং যে হারে স্বাদু আমের প্রতুলতা কমছে। সে যাই হোক এতোকাল ধরে আমি নিজেকে ঐ 'আমজনতা' হিসাবেই গণ্য করে এসেছি - কারণ আমাদের জ্ঞাতি-গুষ্ঠির মধ্যে চেনা-জানা কারোরই কোনও রকমের পলিটিক্যাল পাওয়ার তো দূরের কথা, পলিটিকসের সাথে চেনা-জানা কারোর আলাপ পর্যন্ত নেই। এমনকি পুলিশ, ল-ইয়ার, পঞ্চায়েত-নেতা, পার্টিবাজ, বোমাবাজ, নিদেনপক্ষে গুন্ডা বা চাঁদাবাজ কারোর সাথে কোন জানা-শোনা নেই। সুতরাং আমি 'আমজনতা' হবো না তো, কি 'ইয়ে' হবো ?

কবিগুরু বলে গিয়েছিলেন “আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না” - খুবই খাঁটি কথা। বছরখানেক আগে শীতের ছুটিতে দেশে গিয়েছি। এখান থেকে নিয়ে যাওয়া আমার মোবাইল সেটটিকে এক বই-কাগজ-বিক্রীওয়ালা ভালোবেসে 'নিজের মনে' করে নিয়ে চলে গেছে। অত:পর দেশী এক চায়না-মোবাইল সেট কিনে কাজ চালিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু চাইনিজরা বোধহয় তেমন জল-টল খায় না। এক দুপুরে জামাকাপড় কাচার সময় বালতির জলের মধ্যে মাত্র একবার চোবানি খেয়েই প্যান্টের পকেটে বন্দী থাকা সেই চাইনিজ সেটটি যুগপৎ বোবা আর অন্ধ হয়ে গেলো। কি আর করা ! মোড়ের কাছের মোবাইল ফোনের বুথটাতে গেলাম। আগে এই ছোট্ট দোকানটা শুধুমাত্র STD/ISD-র ব্যবসা করেই লালে-লাল হয়ে উঠেছিলো। বামফ্রন্ট জমানার মতোই সে সুখের দিন আর নেই - মুঠো-ফোন আসার পর ইদানিং সে-ব্যবসায় বেশ কিছুটা ভাঁটা পড়ে গেছে। এখন বেচারাকে ফোন কার্ড বিক্রির সাথে সাথে জেরক্স-এর কাজ করে দিন গুজরান করতে হচ্ছে। আমি আমার সেই মৃত সেটটা দোকানদারকে দেখালাম। দোকানদার অভিজ্ঞ এক ডাক্তারের মতোই উল্টে-পাল্টে, বেশ কিছুক্ষণ ধরে সেটটাকে দেখে গম্ভীর মুখে রায় দিলো, 'আপনার মোবাইলটা ফ্ল্যাশ করাতে হবে' - আমি গোবেচারার মতো পাশের টুলটায় বসে পড়লাম। যস্মিন দেশে যদাচার.... বসে আছি তো আছিই। ডাক্তারসাহেব মোবাইলটাকে তার কম্পুটারের সাথে লাগিয়ে দিয়ে আমাকে ছাইপাঁশ কি সব দেখিয়ে চললো। কিছুক্ষণের মধ্যেই জেনে গেলাম যে এ দোকানে মোবাইল সার্ভিসিং-এর পাশাপাশি মোবাইলে গান ভরেও দেওয়া হয়, 'ফেলো কড়ি মাখো তেল' পন্থায়। কিছুক্ষণ পরপর নিরীহগোছের মানুষেরা মোবাইল ফোন নিয়ে আসছে - আর ফোনের মেমরি কার্ড ভর্তি করে গান নিয়ে যাচ্ছে। 'কপিরাইট' বলে কোনো কিছু এরা বাপের জন্মে শুনেছে বলে মনে হয় না। বুঝলাম ট্রেনে কিংবা বাসের ভীড়ের মধ্যে তারা তাদের আদরের চায়না-সেটগুলোতে অত্যন্ত মমতা নিয়ে এইসব গানগুলো বিকট স্বরে চালিয়ে, আশেপাশের সবাইকে গান-পাগল করে তুলে, নিজেরা উদাস হয়ে যাবে। আমি ধৈর্য্য ধরে বসেই আছি আমার মোবাইলটার চিকিৎসা হওয়ার অপেক্ষায়। এ সময় আমার পিছন থেকে এক বয়স্ক লোক এসে তার ফোনের মেমরি কার্ডটা দোকানদারকে দিয়ে বললেন, 'কিছু ভালো গান ভরে দ্যান তো...' - তার গলা শুনে আর মুখ দেখে আমার কিছুটা চেনাচেনা লাগলো। যতদূর মনে পরে সে একসময় হাত দেখা, ঘটকালির সাথে সাথে পার্ট-টাইম পূজারী গোছের কিছু কাজ করে বেড়াতো। দোকানদার জিজ্ঞেস করলো, 'এখনকার গান দেবো, না কি পুরানো দিনের'? তো সে জবাব দিলো, 'দাও কিছু মান্না-হেমন্ত, কিছু দ্বিজেন্দ্রগীতি, নজরুল-বাউল, লোকগীতি, সব মিলিয়ে মিশিয়ে' - শুনে মনে হলো গান নয়, যেন মশলা-মুড়ি বা পাপড়ি-চাটের অর্ডার দেওয়া হচ্ছে !! কিন্তু তবুও মনে মনে তার তারিফ না-করে পারলাম না। এ ঘোর অরাজকতার যুগে হিন্দী লারেলাপ্পা, রক বা so called জীবনমুখী গান ছেড়ে নজরুল-দ্বিজেন্দ্রলালের গান, বা বাউল গান শোনার মতো লোক স্বচক্ষে দেখতে পাওয়া মুখের কথা নয়। ফোনে গান গোঁজা শেষ হলে দোকানদার লোকটার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকালো, যদি আরও কিছু ব্যবসা বাড়ানো যায় আর কি - বললো: 'এটাতে অনেকটা জায়গা খালি আছে - আর কিছু দেবো কি ?' - এবার সেই লোকটা আমার দিকে একটু আড়চোখে তাকিয়ে, কিছুটা চাপা স্বরে ফিসফিসিয়ে বললো, 'দ্যান, কিছু বাংলা-এক্স ভিডিও-গান ঢুকিয়ে দ্যান...' - দমকা কাশির মতোই আমার হঠাৎ ভীষণ হাসি এসে গেলো। অনেক কষ্টে নিঃশ্বাস চেপে, মুখটাকে শক্ত করে আমি বসে রইলাম। কিছুই যেন শুনতে পাইনি এমন ভঙ্গিতে উল্টো দিকে তাকিয়ে রইলাম - লোকটার দিকে তাকালে হয়তো সে লজ্জা পাবে। এবারও দ্রুত গান-গোঁজা শেষ করে দোকানদার বললো, 'এখনও কিছু জায়গা খালি আছে, আর কি দেবো তাড়াতাড়ি বলুন...' - লোকটা গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো, 'ভাটিয়ালি কিছু আছে কি ?' - দোকানদার এবার না-সূচক মাথা নাড়লো - অর্থাৎ ভাটিয়ালি গান তার গান-গুদামে নেই। লোকটার আচরণে আমি এবার একই সঙ্গে আশ্চর্য এবং দুঃখিত হলাম। হঠাৎ করে আমার মনে হলো এরাই হচ্ছে আমাদের দেশের আসল 'আমজনতা' - যাদের কাছে 'খচ্চর-গাধা-ঘোড়া-ময়ূর-বুনিপ', সবারই এক দাম। এরা 'সোনার কেল্লা' দেখেও আনন্দ পায়, আবার 'মিশর রহস্য' দেখেও হাততালি দেয় !! তবে দোকানদারটাই বা কেমন ধরণের মানুষ !! খারাপ জিনিস রাখে, এটা নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ করার অধিকার আমার নেই - তাহলে 'ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে' - তা-বলে তুই হতচ্ছাড়া দু'চারটে ভালো জিনিষও রাখবি না !! “এ তুমি কেমন তুমি - অ্যা:?” - ইচ্ছা করছিলো ব্যাটার পশ্চাৎদেশে কষে একটা লাথি মারি। কিন্তু 'টেকনিক্যাল ডিফিকাল্টির' জন্যে সেটা করা গেলো না - কারণ দোকানদারের স্বাস্থ্য আমার চেয়ে অনেক ভালো !! 

রিয়ালাইজেশান: 'আমজনতা'-র ক্ষমতা খুবই কম - তাই ইচ্ছা থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই কোনও উপায় থাকে না।

Saturday, March 1, 2014

ঘটনার ঘনঘটা...

আমার অফিসে কর্মরত ইন্ডিয়ানদের মধ্যে মূলত: দু'ধরণের গ্রুপ আছে - একদল, যারা বেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ - খালি স্টক, শেয়ার, সেকেন্ড মর্টগেজ, রথ আই-আরে, অ্যামেরিকান বেসবল/সকার, ট্যাক্স, ফান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ইত্যাদি নিয়ে কপচাতে থাকে। আর সংখ্যালঘু আরেকদল বেশ আলটপকা জিনিষ নিয়ে কথা বলে, at least লাঞ্চ টাইমে খেতে বসে। আমি সাধারনত: ওই সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রুপটিকে সযত্নে এড়িয়ে চলে অন্য গ্রুপটির সাথে বসে লাঞ্চ সেরে নিই, যদিও ভালো করেই জানি যে তাদের কাছ থেকে জীবনযাপনের উপযোগী কোনো কার্যকরী টিপস বা সাজেশন আশা করা একেবারেই অবান্তর। এই যেমন আগের দিন কে-একজন যেন প্রশ্ন করলো যে ব্রেনের কোন অংশটা ঠিক করে, যে আজ বাড়ি ফিরে কি খাবো, বা এই উইকেন্ডে কোন সিনেমা দেখবো, ইত্যাদি। এটা একেবারেই বাচ্চাদের প্রশ্ন - এই প্রশ্নের উত্তর আমি একসময় খুব ভালো করেই জানতাম। কিশোর বয়সে এই ধরণের মামুলি নিউরোসায়েন্স প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় আমি ব্রেনের ছবি এঁকে সঠিক Lobe-টা হাইলাইট করে দিতাম - কিন্তু কোন এক দূর্বোধ্য কারণে আজ সেই উত্তরটা একদমই  মনে করতে পারলাম না। কিছুপরে আরেকজন কে বলে উঠলো যে premonition-এর কোনো রিয়েল এক্সপেরিয়েন্স কারোর কখনো হয়েছে কি না। এই প্রশ্নটা শুনতেই মাথায় চড়াক করে, যাকে বলে একেবারে স্পার্ক খেলে গেলো। এরকম ঘটনা আমার জীবনে গোটা কয়েকবার ঘটেছে - যাকে বলে হান্ড্রেড পার্সেন্ট premonition না হলেও, অন্তত: ৮৫% তো বলা যেতেই পারে!! হঠাৎই মনে হলো অনেক কাজ বাকি পড়ে আছে - তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে, ডেস্কে ফিরে এসে কিছুটা উদ্দেশ্যবিহীন ভাবেই premonition নিয়ে গুগল-সার্চ করে চললাম। Premonition কথাটার মানে জানলেও সেটা কেন জানিনা আমার সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে কখনো এক করে ভেবে দেখিনি। তবে আমার সে অভিজ্ঞতার কথা এখানে বললে কিছুটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে - নিজের জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত কথাবার্তা সবসময় চেঁচামিচি বা পাগলের প্রলাপ হয়ে দাঁড়ায়, বাকি সবাইয়ের কাছে। তাই একটা সিমিলার ঘটনার আড়ালে সেটা বলার চেষ্টা করা হলো এখানে। এই ঘটনা বর্ণনায় দরকার একজন নায়িকা, তার নায়ক, আর আরেকজন থার্ড-পারসন-সিঙ্গুলার নাম্বার। ইচ্ছা করেই এই তিনজনের কোনো নামকরণ করা হলো না - তার দরকারও নেই। এই তিনজনকে স্রেফ 'নায়ক', 'নায়িকা' আর 'লোক' হিসাবেই রেফার করা হলো। 
The part of the brain that controls discernment is the frontal lobe or the prefrontal cortex
......... আজ তার জন্মদিন - ঘুম থেকে উঠেই খুশিতে নায়িকা ডগমগ হয়ে উঠলো, কারণ একটু পরেই তারা শপিং করতে বার হবে - একটা দামি কোন জুয়েলারী কেনার উদ্দেশ্যে, সেটাই হবে তার অফিশিয়াল বার্থ-ডে প্রেজেন্ট। হাতের কাজগুলো সব ঝটপট সেরে নিয়ে, স্নান-টান সেরে, সেজেগুজে তারা দুজনে বেরিয়ে পড়লো কাছের শপিং কমপ্লেক্সটার দিকে। কেনাকাটি শেষ হলে, কোনো ভালো একটা রেঁস্তোরায় লাঞ্চ সেরে নিয়ে তারা একটা কোন নতুন মুভি দেখতে যাবে - আপাতত: এইই হলো তাদের প্ল্যান। উইকেন্ডের বাজারে দোকানগুলোতে মোটামুটি ভালোই ভীড় হয়েছে - বিশেষ করে ফ্যাশন রিলেটেড দোকানগুলোতে। শপিং কমপ্লেক্সে ঢুকে নায়িকাকে তার নিজের পছন্দমতো দোকানগুলোতে ইচ্ছামতো ঘুরতে দিয়ে নায়ক সামান্য কিছু ডিসট্যানস রেখে চলতে থাকলো। ইদানিং তার এজাতীয় দোকানগুলোর প্রতি অজানা এক বিরক্তি জমতে শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু আজকের এই বিশেষ দিনে সে-সব কিছু মাথায় না-আনাই ভালো। অবশেষে এক পপুলার দোকানে বেশ কিছুক্ষণ ধরে অনেকগুলো আইটেম নাড়াচাড়া করার পর কয়েকটা অর্নামেন্ট নায়িকার হিটলিস্টে ঢুকে পড়লো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এগুলোর কয়েকটার দাম একেবারেই কম - কারণ সেগুলো দেখতে ভালো হলেও, কোন আসল স্টোন বা নামী-দামী মেটালের নয়। আবার বাকিগুলোর দাম তাদের বাজেটের থেকে বেশ কিছুটা বেশি !! সুতরাং কি করা যায় তা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ করে তার সেই সিক্সথ সেন্সের অস্বস্তির ভাবটা আবার প্রকট হয়ে উঠলো। ঘাড় ঘোরাতেই নায়িকা “সেই লোকটিকে” দেখতে পেলো - খুবই সাধারণ, অনুজ্বল পোশাকপরা প্রায় মাঝবয়সী এক লোক, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পিঠে বোধহয় একটা ব্যাকপ্যাক - দু'পকেটে দু'হাত ঢুকিয়ে, তার থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ভাবলেশহীন মুখে এদিকেই চেয়ে আছে - তাকিয়ে আছে ঠিক তার দিকে নয়, বরং তার পছ্ন্দ করা সেই জিনিষগুলোর দিকে। আচমকাই নায়িকার এ দোকানটা আর তেমন ভালো লাগলো না, অন্য দোকানের দিকে পা বাড়ালো সে। বেশ কিছুক্ষণ এ-দোকান, সে-দোকান ঘুরে ঘুরে চললো সে। এখন তার দৃষ্টি শুধু জুয়েলারীর দিকেই সীমাবদ্ধ নয় - আড়ালে আড়ালে সে লক্ষ্য রেখে চলেছে যে লোকটা কি তাকে সত্যিই ফলো করছে - না কি সবই তার মনের ভ্রান্ত কোনো ধারণা। কিন্তু তার আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয় - বাস্তবিকই সে লোকটাকে ঠিক খুঁজে পেয়ে যাচ্ছে - হয় পাশের দিকে, নয় কিছুটা পিছনে, অ্যাঙ্গেল করে 'সেই হতচ্ছাড়া' মোটামুটি তার দিকেই তাকিয়ে আছে - যদিও কখনই সে তার চোখে চোখ রাখছেনা। এবার নায়িকা ঠিক করলো আচমকাই সে কমপ্লেক্স থেকে বার হয়ে গিয়ে অন্য কোন দোকানে ঢুকে পড়বে। সেই মতো কাছের এক্সিটটা আসতেই সে এসকালেটারে উঠে পড়লো - এবারে পিছনে তাকিয়ে ধারে কাছে কোথাও সে লোকটাকে দেখতে পেলো না। স্বস্তির একটা নি:শ্বাস ফেলে শপিং কমপ্লেক্সটা থেকে বার হয়ে রাস্তায় পড়তেই আচমকা সে লক্ষ্য করলো যে রাস্তার অন্য ফুটপাথ দিয়ে, প্রায় তাদের সমান্তরাল ভাবেই সেই লোকটি হেঁটে চলেছে - তবে তার দৃষ্টি সোজা সামনের দিকে। হঠাৎ করেই মনের মধ্যে যেন একরাশ বিরক্তি দলা বাঁধতে শুরু করলো, আর তার সাথে জমতে থাকলো এক অজানা রাগ। বেশ কিছুটা হেঁটে, ঝট করে ডাইনে বেঁকে নায়িকা একটা দামী জুয়েলারী দোকানের দরজা খুলে তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়লো। এই দোকানটি বাস্তবিকই উচ্চবিত্তদের জন্যে - জিনিষপত্তের কোয়ালিটির সাথে সেগুলোর দামও বেশ চোখে পড়ার মতোই !! কিন্তু নায়িকার মনের মধ্যে কেমন যেন একটা জেদ ঢুকে গেছে। এই কেনাকাটির ঝামেলা সেরে তাকে দ্রুত এই চত্ত্বরটা থেকে বার হতে হবে। একটা ডার্ক গ্রীন কালারের এমারেল্ডের সেট তার খুব পছন্দ হয়ে গেলো। যদিও এই সেটটার দাম তাদের অরিজিনাল বাজেটের প্রায় দেড় গুনেরও বেশি, কিন্তু তার মাথায় এখন ঝোঁক চেপে গেছে - এটাকেই-ই সে আজ কিনবে। এবার তার মনে হতে লাগলো যে একদিক দিয়ে হয়তো ভালোই হয়েছে, কারণ সেই লোকটি না থাকলে তারা হয়তো এই দোকানে ভুলেও আসতো না - আর এই সেটটা এককথায় অসাধারণ লাগছে তার কাছে - দাম হয়তো একটু বেশি, কিন্তু সত্যিই কি দারুণ বেশি? এমন জিনিষ সে আর কোথাও আগে দেখেছে বলে মনে করতে পারলো না। ঝট করে যেমন তার মনে একরাশ বিরক্তি এসে গিয়েছিলো, ঠিক তেমনি করেই আবার খুশির চোরাগোপ্তা প্যাঁচে মনটা ক্রমশ: ভালো হয়ে উঠতে লাগলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার নায়কটি অবশ্য এসব কিছুই জানতে পারলো না, পারার কথাও অবশ্যি তার ছিলোনা - তার মনের মধ্যে কেবল একটাই প্রশ্ন ঘুরে চলেছে, 'আর ক'টা দোকান আমরা ঘুরে ঘুরে চলবো'!! দাম দরাদরির প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পড়েছে তারা - হঠাৎই এসময় শো-কেসের স্বচ্ছ গ্লাসের রিফ্লেকশানে নায়িকা পরিস্কার দেখতে পেলো যে তাদের ঠিক অন্যপাশেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সেই লোকটি - আর তার দৃষ্টি এবারেও তার পছন্দ করা সেই সেটটার দিকেই। আর চুপ করে সে থাকতে পারলোনা - মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছে এবার। সে সরাসরি লোকটার দিকে ঘুরে, প্রচন্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠলো: কি পেয়েছেন কি আপনি? এভাবে আমাকে ফলো করে চলেছেন কেন? পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নায়কটি অবাক হয়ে গেলো, কিন্তু সে যথাযথ নায়কোচিত ভাবেই হাতের জামা গুটিয়ে, মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে এগিয়ে গেল লোকটার দিকে - যদিও সে লোকটির কোনো দোষ খুঁজে পেলো না। নিতান্ত গোবেচারার মতোই লোকটি ভ্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার নায়িকার সামনে। তো-তো করে সে কিছু বলে ওঠার চেষ্টা করলো - কিন্তু তার সে'কথায় কোন ভ্রুক্ষেপ না দিয়ে, প্রচন্ড রাগে জ্বলতে জ্বলতে নায়িকা তার নায়ককে জোর করে টেনে নিয়ে দোকান থেকে বার হয়ে পড়লো। চুলোয় যাক কেনাকাটা, আজকের দিনটাই খুব বাজে !! আর কোথাও না-গিয়ে সোজা বাড়ির দিকে ফিরে চললো তারা। বাড়িতে ফিরে এসে ফোনের মেসেজবক্সের দিকে চোখ পড়তেই নায়িকা দেখলো বিপ-বিপ করে লাল আলো জ্বলে চলেছে সেখানে - একটি নয়, তিন তিনটি মেসেজ জমা হয়ে আছে ওটাতে। প্লে-বাটন চাপতেই ফোনের যান্ত্রিক কন্ঠ বলে চললো, নায়িকার বাড়ির খবর ভালো নয় - তার বাবাকে হসপিটালাইজড করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি - হৃদপিন্ড আর ঠিকঠাক কাজ করছে না - অপারেশানের প্রয়োজন এক্ষুনিই - কিন্তু খরচের অন্তত: ৮০% টাকা একসাথে জমা না-দিলে ভালো কোনখানে অ্যাডমিশন করানো যাবেনা - তাই চাই টাকা, বেশ কিছু টাকা, অবিলম্বেই।    

হঠাৎই নায়িকা বিহ্বল হয়ে পড়লো - আজকের এই জন্মদিন, হাসি-আনন্দ, জুয়েলারী কেনা, তাকে ফলো-করে চলা সেই লোকটি - এ সবকিছুই এখন খুব অর্থহীন হয়ে উঠলো। শুকনো গলায় নায়ক এ সময় বলে উঠলো, একদিক দিয়ে জুয়েলারী না-কিনে ভালোই হয়েছে। ওই টাকাটাই বরং ওয়ার-ট্রান্সফার করে দেওয়া যাক এখন - কিনলেই বরং আবার ফেরত দেবার ঝামেলায় পড়তে হতো। এ কথায় সম্বিৎ ফিরতেই নায়িকার মনে সহসা সন্দেহ দেখা দিলো, তাহলে কি সেই লোকটি.... সেই লোকটিই কি আগে থেকে এসবের কিছু জানতো... এ জন্যেই সে কি তাকে ফলো করে চলছিলো? এই সব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ 'ডিং-ডং' সুরে দরজার কলিংবেলটা বেজে উঠলো। দরজা খুলতেই তারা আরও অবাক - সেই লোকটাই বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঘরে ঢুকতে দেওয়া আদৌ ঠিক হবে কিনা, তা স্থির করার মাঝেই লোকটি বলে উঠলো: “ম্যাডামের রাগ কি এখন কমেছে একটু ?” - এরপরও তাকে ঘরের ভিতরে আসতে না-বললে খুব খারাপ দেখায়। অত:পর কুন্ঠিত পদক্ষেপে ঘরে ঢুকে, জড়োসড়ো ভাবে সোফার এক কোনে বসে পড়ে লোকটি - জানায় যে নায়িকাকে সে আসলেই ফলো করে চলছিলো, যাতে কোনো জুয়েলারী না-কেনা হয়ে ওঠে। কিন্তু 'কেন', এ প্রশ্নের কোনো সঠিক জবাব সে দিতে পারে না - কেবল বলে, যে কিছু মুষ্ঠিমেয় প্রিয়জনদের আগাম কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার খবর সে পেয়ে যায় কোনও ভাবে, আগে থেকেই। নায়িকা চমকে গিয়ে বলে সে তো জীবনে লোকটিকে আগে কোথাও দেখেনি - ঘনিষ্ঠতা তো দূরের কথা, তাহলে? লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে ওঠে: ঠিকই, আমরা কেউ কাউকে চিনি না - কিন্তু আপনার মুখের সাথে আমার প্রেমিকার মুখের প্রচুর মিল ছিলো। এবার আরও কৌতুহল বেড়ে ওঠে তাদের - 'ছিলো' মানে? তো, সেই প্রেমিকার নাম কি, আর কোথায়ই বা আছে সে এখন। কিন্তু সে-সব প্রশ্নের উত্তরে লোকটি চুপচাপ, মুখ নীচু করে বসে থাকে। অত:পর যেন অনেক কষ্ট হচ্ছে, এরকম যন্ত্রনাকাতর ভাবে মুখ তুলে সে ধীর কন্ঠে বলে ওঠে যে তার সেই প্রেমিকা 'আরো ভালো' কাউকে খুঁজে নিয়ে চলে গেছে - কোথায় গেছে জানা নেই, কিন্তু তার নিজের premonition আজও ঠিকই কাজ করে চলেছে - এমন কি মুখের মিল থাকা সম্পূর্ন আলাদা কোনো মানুষের সম্পর্কেও... ~~~~ ঘটনার ঘনঘটায় তারা তিনজনেই হতবাক হয়ে গেলো। কেবল ঘরের দেওয়ালে ঝোলা ঘড়ির পেন্ডুলামটা টিকটিক শব্দে বেসুরো আওয়াজ করে দুলে যেতে লাগলো।       

   
মাস খানেক পরের ঘটনা: 
নায়িকার বাবা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছেন - সময়মতো এবং সঠিক অস্ত্রপচারের দৌলতে ঈশ্বর তাঁকে আপাতত আরও কিছুকাল বাঁচার অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন। নায়িকা ঈশ্বরের সাথে সাথে সেই অজানা লোকটিকেও মনে মনে অজস্র ধন্যবাদ দিয়ে চলে, আজও। দূর্ভাগ্যবশত: লোকটার নাম জানা হয়ে ওঠেনি সে'দিন - প্রয়োজনই বোধ করেনি তারা কেউই - তাই সে এখন কোথায় আছে, তা একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারেন।   



Sunday, January 19, 2014

হলুদ গাঁদার ফুল দে এনে দে...

পূজা বাঙালীর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ - বাঙালী thrives on পূজা। বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগে থাকলেও আমাদের ছোটবেলাকার সময়ে 'পূজা' বলতে মোটামুটি তিনটে পূজাকেই ধরা হতো। প্রথম obviously দেবী দূর্গা - অর্থাৎ দূর্গাপূজা - যা কিনা বাঙালী ঐতিহ্য আর জাঁকজমকের প্রতীক। তাঁরই হাত ধরে ধরে চলে আসতেন শক্তিময়ী কালীঠাকুর, যে পূজা ছিলো মূলত: আতসবাজি আর আলোর রোশনাইয়ের যুগল সম্মেলন।  এরই মাস তিন-চার পরে আসতো সরস্বতী পূজা - যা ছিলো এককথায় ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের, এবং বিদ্যার্থীদের একান্ত আপনার পূজা। লক্ষ্মী, জগদ্ধাত্রী বা বিশ্বকর্মা পূজোগুলোকে ঠিক সেই অর্থে পূজা বলে মনে হতো না। অবশ্য এসবই সেকালের কথা। আজকাল অবশ্য যে কোন পূজা এলেই সর্বপ্রথম  ডোনেশন, শব্দ-হুঙ্কার, মদ-মারামারি আর দূর্ধর্ষ জ্যামের কথাই মনে চলে আসে - ভক্তি আর তেমন ঠিক আসেনা।
আমাদের বাড়ির ছাদ 
দূর্গাপূজায় মনে ভক্তির থেকে বরং শ্রদ্ধা আর সম্ভ্রমের ভাবই বেশি করে জাগতো - সেটার পিছনে অবশ্য শ্রদ্ধেয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মহাশয়ের রোমাঞ্চকর, মন্দ্র-মুগ্ধ কন্ঠে মহালয়ের ভোরের স্ত্রোত্র-পাঠের একটা জোরালো ভুমিকা থাকতো। কালীপুজায় লক্ষ্য থাকতো কখন তৈরী-করা ছুঁচো-তুবড়ি গুলোকে, বা বাজার থেকে কিনে আনা আতসবাজি গুলোকে একের পর এক ফাটাবো, বা কিভাবে বাড়িটাকে টুনি বাল্বের আলো দিয়ে সাজাবো, এইসব। কিন্তু সরস্বতী পূজায় মনের নির্বিচল ভক্তি আর প্রার্থণা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতো। কি করে, বা কারা যেন যেন মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো যে সরস্বতী ঠাকুরকে ভক্তি না-জানালে পরীক্ষায় কখনোই ভালো কিছু করতে পারবো না - তা সে যে পরীক্ষাই হোক না কেন! সেই ভয় থেকেই মনে হয় চলে আসতো ভক্তি - আর তারই হাত ধরে ধরে কখন চলে এসেছিলো ভালোবাসা। সন্ধ্যার দিকে  বাবা অফিস থেকে ফিরলেই তাঁর হাত ধরে ট্রেনে চেপে উঠে পড়তাম কলকাতার দিকে। কখনো ঢাকুরিয়া, কখনো বালিগঞ্জ, কি শিয়ালদহের নানান রাস্তা ধরে ঘুরে ঘুরে, সারি-সারি ঠাকুরের মধ্যে থেকে আমাদের পকেটের পূজার বাজেট স্ট্রেচ করতে করতে, ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে সেরা ঠাকুরটি বেছে নিতাম। তারপর তাঁকে ঘাড়ে করে নিয়ে, ট্রেনের ভীড়ের হাত থেকে সযত্নে আগলে রেখে, নানান পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বাড়ি পৌঁছাতাম। প্রায় মধ্যরাতে বাড়ি ফিরে মা-পিসিমার শাঁক বাজানোর শব্দে হঠাৎই খেয়ালে আসতো যে কি ভীষণ ক্ষিদে পেয়ে গেছে!! 

বাবা এর কয়েকদিন আগে থেকে, বাজার থেকে কিনে যোগাড় করে রাখতেন চাঁদমালা, শোলার কারুকাজ করা ঠাকুরকে সাজানোর নানান ধরনের জিনিষ, যাবতীয় পুজাসামগ্রী, আর কিনে আনতেন রং-বেরঙের পাতলা পাতলা ঘুড়ির কাগজ - লাল-নীল-হলুদ-বেগুনী-সবুজ-সাদা-কমলা। রাত জেগে জেগে সেগুলো কাঁচি দিয়ে ট্র্যাঙ্গেল আকারে কেটে, থাক-থাক করে গুছিয়ে রাখা হতো। ঠাকুরের হাতে থাকা বীণার গায়ে কয়েকটা সাদা মোটা সুতো আলপিন দিয়ে সযত্নে বেঁধে দেওয়া হতো, সেটার  'তার' হিসাবে। পূজার দিন ভোরসকালে উঠে, ঘাড়ে করে কাঠের মই নিয়ে, বাড়ির ছাদে গিয়ে হাজির হতাম সেইসব রঙিন কাগজগুলোকে সঙ্গে করে - সাথে থাকতো একবাটি আঠা আর টুনদড়ির গোলা। বাড়ির ছাদের ঠাকুরঘরের মাথা থেকে ছাদের রেলিঙের নানান দিক পর্যন্ত টুনদড়ি টাঙিয়ে টাঙিয়ে সেই সব তিনকোণা কাগজগুলোকে, রঙের কম্বিনেশন বজায় একের পর এক আঠা দিয়ে লাগিয়ে চলতাম। শীতশেষের সকালের মৃদুমন্দ হাওয়ায় সেই রঙিন কাগজের দলেরা যেন হেসে হেসে কাঁপতে থাকতো। বাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও এসময় ঠাকুর ঘর সাজানোর নানান কাজে লেগে যেতো - সে ছিল এক অদ্ভুত আনন্দ, উত্তেজনা আর ভালোলাগা সময়। এরই মাঝে নীচের তলা থেকে মায়ের হাঁক শোনা যেতো, "ওরে! ঠাকুর মশায় এসে গেছেন!" - তড়িঘড়ি করে স্নান করার জন্যে নিচে নেমে আসতাম।  ঠাকুরমশায় এই দিন থাকতেন মহাব্যস্ত - কিছুতেই একমুহূর্ত বেশি অপেক্ষা করতে চাইতেন না। শাঁক-কাঁসরঘন্টা বাজানোর মধ্য দিয়ে দাদা ঘাড়ে করে দেবীপ্রতিমাকে নিয়ে চলতেন নিচের তলা থেকে ছাদের ঠাকুরঘরের দিকে। ছোটদি বাড়ির টবে ফুটে থাকা গাঁদাফুল তুলে, মালা তৈরী করে ঠাকুরের গলায় দিয়ে দিতেন। বাজার থেকেও কিনে আনা হতো হালকা-হলুদ, গাড়-হলুদ, কমলা রঙের একগুচ্ছ গাঁদাফুলের মালা। সেই সমস্ত মালা পরে, চাঁদমালা হাতে নিয়ে সুসজ্জিত হয়ে, আমাদের ছোট্ট ঠাকুরঘর আলোয় ভরিয়ে দিয়ে বিরাজমান হতেন দেবী সরস্বতী। আমরা পুকুর থেকে চট করে একটা ডুব দিয়ে, বা কলঘরে ঢুকে  কোনোমতে এক বালতি জল মাথায় দিয়ে, গা-হাত মুছে, নতুন জামাকাপড় পরে ঠাকুরঘরের দিকে ছুটতাম, হাতে থাকতো বেশ কয়েকটা পড়ার বই - যার মধ্যে কেশবচন্দ্রের অঙ্কের বই, মাইতি-চৌধুরীর কেমিস্ট্রির বই, আর রেনে-মার্টিনের ইংরাজি গ্রামারের বই অবশ্যই থাকতো প্রাইম সদস্য হিসাবে। সেই বইগুলোকে দেবীর পায়ের কাছে সারি দিয়ে সাজিয়ে, হাত জড়ো করে বসে যেতাম ঠাকুর মশায়ের পাশে বা পিছনে - যে যেরকম পারে। মেঘমন্দ্র কন্ঠে ঠাকুরমশায় দেবী-স্ত্রোত্র পাঠ করে চলতেন। ধুপ-ধুনোর অপরূপ গন্ধে ভরা সেই  ঠাকুরঘরে বসে, একগাদা গাঁদাফুলের মালায় সুসজ্জিত সেই দেবী প্রতিমার প্রশান্তি-ভরা, অসম্ভব সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে বিভোর হয়ে যেতাম - অবাক মনে বিস্ময় জাগতো গতরাতের থেকেও আজ যেন তাঁকে আরো, আরও বেশী করে সুন্দর এবং প্রাণময়ী লাগছে !

অঞ্জলীর দেওয়ার পর  প্রণাম-প্রাথর্ণা শেষ করে আমরা ছাদ সাজানোর কাজকর্ম, যা-কিছু বাকি থাকতো, সব ঝটপট কমপ্লিট করে নীচে নেমে আসতাম। দিদিরা এর মধ্যে ঠাকুরঘরের কাজ গুছিয়ে প্রসাদ বিতরণ শুরু করে দিতেন। তার পর শুরু হতো বাড়ির দাওয়ায়, রোদ্দুরে মাদুর পেতে বসে, একসাথে খই-মুড়ি-কড়াইশুঁটি-নারকেল-শাঁকালু-মোয়া-নলেনগুড় সহযোগে নিরামিষ ব্রেকফাস্ট-কাম-লাঞ্চ - আর তার সাথে নির্ভেজাল আড্ডা, গল্পের বই পড়া - সময়ের কোনো হিসেবই থাকতো না। দূর-দূরান্তের পূজামন্ডপগুলো  থেকে ভেসে আসতো মাইকে বেজে চলা একের পর এক বাংলা গান - যার একটা আজ খুব করে মনে পড়ছে: “রূপকুমারী মেয়ে মান করেছে - বাঁধবে না চুল, সে বাঁধবে না রে - হলুদ গাঁদার ফুল দে এনে দে...”