Monday, November 25, 2013

Black Friday অ্যান্ড আইনস্টাইনের 'থিওরী অফ রিলেটিভিটি'

এদেশে আসার আগে জানতাম যে BF মানে হলো গিয়ে 'বয় ফ্রেন্ড', যে রোলে পার্ট করার চান্স আমি খুব একটা পাই-ই নি। আরেকটা দুষ্টু মানে হলো গিয়ে 'নীল সিনেমা', যেটাও সময়কালে দেখা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এদেশে আসার পর জানলাম BF-র আরেকটা অন্য মানে - সেটা হলো 'Black Friday' অর্থাৎ 'কালো শুক্রবার' - আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে, 'ThanksGiving'-এর ঠিক পরের শুক্রবার। আনওফিসিয়ালি এই দিন থেকে এদেশে হলিডে শপিং শুরু হয়ে যায়। প্রায় যাবতীয় রিটেলার ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো অনেক জিনিসের ওপর স্পেশাল ডিসকাউন্ট বা 'bargain deal' দেয়, যাতে পুরানো স্টকের জিনিসপত্র সব বিক্রি হয়ে যায় - অনেকটা আমাদের দেশের 'চৈত্রের সেলের' মতোই। Black বলার কারণ, সাধারণত অ্যাকাউন্টিয়ে হিসাবের খাতায় লাল কালি ব্যবহার করা হয় 'loss' বোঝাতে আর কালো কালি ব্যবহার করা হয় 'profit' বোঝানোর জন্যে। বহু রিটেলারের কাছেই বছরের সেরা প্রফিটেবল দিন হলো এটাই। তো বছরের এই স্পেশাল দিনটিতে আমেরিকানরা শপিং-এর জন্যে ভীষনভাবে সিরিয়াস ও পাগল-প্রায় হয়ে ওঠে। ভাবখানা এমন করে যেন এদিন কিছু না-কিনতে পারলে গোটা জীবনটাই তাদের বৃথা হয়ে যাবে - কিছু একটা কিনতে হবেই যেন তাদের!  অবশ্য আমেরিকানদের সাথে পাল্লা দিয়ে এশিয়ানরা, এমন কি ইন্ডিয়ানরাও কিছু কম যায় না। 'ঝাঁকের কই'-এর মতো সেই স্রোতে গা-
ভাসিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে আমিও এক Black Friday-র কনকনে ঠান্ডা, শীতের ভোরে ৪:১৫ থেকে FRY'S নামের এখানকার এক পপুলার ইলেকট্রনিক্স স্টোরের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে গেছিলাম। সামনে পিছনে অজস্র লোক - সবাই যেন কেমন মোহগ্রস্ত হয়ে এক অজানা কোন চরম প্রাপ্তির জন্যে সাগ্রহে অপেক্ষা করে যাচ্ছে। সে দোকান খুললো কাঁটায় কাঁটায় সকাল ৬টায়। মুহুর্তের মধ্যে প্রায় হাজারটা লোক একসাথে দোকানের বিশাল দরজা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলো। পদ-পিষ্ট হতে হতে কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে, ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে দোকানে ঢুকলাম।তারপর যা কিছুই কিনতে যাই সেখানেই দেখি আমার আগে অন্তত গোটা ৭০ জন লোক এসে হাজির হয়ে জটলা পাকাচ্ছে - লাইন বলে কোন কিছু নেই। দোকানের customer service-র ছেলেগুলো দেখি সব স্টেপ-আপ টুলের মাথায় উঠে প্যাকেজিং বক্স গুলো নিয়ে নিচের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। আর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পাগলা জনতা সেগুলোকে 'হরিলুটের বাতাসা লোটার' মতো করে লুফে, কেড়ে নিচ্ছে। আমিও ওদের দেখাদেখি ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে, লাফিয়ে লাফিয়ে কোনরকমে একটা পোর্টেবল DVD প্লেয়ার লুফে নিলাম। তারপর এদিক সেদিক ঘুরে কিছু পড়ে থাকা USB drive, কয়েকটা ডিসকাউন্টেড ডিভিডি, আরও বেশ কিছু হাবি-জাবি জিনিস কিনে, খুশি খুশি মুখে সকাল সাড়ে-সাতটায় বাড়ি ফিরলাম। উদভ্রান্ত চেহারা, ঘুম না-হয়ে চোখদুটো লাল, মাথা ঝিমঝিম, কিন্তু মুখে 'সব পেয়েছির হাসি' - ঝোঁকে পড়ে  কেনা সেইসব জিনিসগুলোর বেশিরভাগই এখনো তেমন ব্যবহার করা হয়ে ওঠেনি। কিছু কিছু এখনও প্যাকড অবস্থায় পড়ে আছে। DVD প্লেয়ারটা বেশ কিছুদিন ব্যবহার করা হয়েছিলো - সম্প্রতি আমার স্বনামধন্য পুত্র সেটাকে নিয়ে “দেখি, ভাঙে কি না” পরীক্ষা করতে গিয়ে এক আছাড়ে প্রায় দ্বি-খন্ডিত করে দিয়েছে - কিন্তু তাও সেটা এখনো চলছে। শুধু তার স্ক্রিনটাকে সাপোর্ট দেবার জন্যে একটা আলাদা করে বালিশ লাগে। 

তার পর থেকে বেশ কয়েক বছর আর স্রোতে গা-ভাসাই নি। 'যেতে দাও, গেলো যারা' বলে ঘুম থেকেই উঠিনি। এবছর ঠিক করলাম যে যাই ঘুরে আসি, দেখি অবস্থা আদৌ improved হয়েছে কিনা - না কি 'সেই ট্র্যাডিশান সমানে চলছে...' - সেই মতো ঘুম থেকে উঠে সকাল আটটা নাগাদ বার হলাম - কোনো তাড়া নেই, জাস্ট উইন্ডো শপিং করবো বলে। কিন্তু যে দোকানেই যাই না কেন, গাড়ি আর পার্ক করতে পারি না। রাস্তার দু'ধার সহ সব পার্কিং লট একেবারে পুরো প্যাকড। লোকজন সব কতো দূরে দূরে গাড়ি পার্ক করে হাঁটতে হাঁটতে আসছে - দেখে আমাদের দেশের দূর্গা পূজার রাতের ঠাকুর দেখার কথা মনে পড়ে গেলো। 
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ ধরে নানান জায়গায় চক্কর কেটে কেটে, শেষমেষ বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরবো কিনা ভাবছি, হঠাৎই নজরে এলো রাস্তার এক ধারে, মেক্সিকান এক ফ্যামিলি ট্রাকে করে প্রচুর তরমুজ নিয়ে হাজির হয়েছে, বিক্রির জন্যে। একজন দুশমন চেহারার বেঁটে লোক, সঙ্গে দুটো ছোট বাচ্চা - সম্ভবত এদের নিজেদের ক্ষেতেরই ফল। তরমুজগুলোর সাইজ দেখতে রীতিমত ঈর্ষণীয়। মনে মনে ভাবলাম দেখতেই যদি এতো ভালো হয়, না-জানি খেতে কতো ভালো হবে। চিন্তা করে দেখলাম একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে, একদম খালি হাতে বাড়ি না ফিরে, বরং একটা তরমুজ কিনে ফেরা যাবে, at least  কিছু তো কেনা হবে। ছোটবেলায় বাবার সাথে বাজার করতে গিয়ে জেনেছিলাম যে তরমুজ সব সময় পাকা অবস্থায় কিনতে হয়, না'হলে  খেতে ভালো নাগে না। যদি দেখা যায় যে তরমুজের গায়ে অনেক অনেক স্ট্রাইপ, তো সেই তরমুজ মোটেই পাকা নয়। বরং যেগুলোর তলার দিকটা একটু হলদেটে রংয়ের, সেগুলোরই পাকা হওয়ার চান্স অনেক বেশি। কিন্তু আমার সামনে থাকা তরমুজগুলো দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না - এগুলোর গায়ে স্ট্রাইপও আছে, আবার নিচের দিকটা কিছুটা হালকা রংয়েরও বটে। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মেক্সিকান বিক্রেতাওয়ালা ও তার দুই ছেলে 'হোলা, হোলা' করে মাথা ধরিয়ে দিলো। আমি আমার বেংলিশ ভাষায় গম্ভীর ভাবে বললাম, দেখো বাপু, ছোটবেলা থেকে বাজার করে এসেছি - সারা জীবনে প্রচুর ধোঁকাও খেয়েছি - তাই এই বুড়ো বয়সে নতুন করে আর আমাকে ধোঁকা খাওয়াতে পারবে না। যদি তরমুজের ভিতরটা টকটকে লাল হয় তো আমি ক্যাশ দিয়ে কিনবো, নইলে কিন্তু আমি 'বাপের কু-পুত্তুর' - একটা পয়সাও, থুড়ি! একটা পেনিও দেবো না ! অনেক কষ্টের পর সে 'হোলা ফ্যামিলি'কে আল্টিমেটলি বোঝানো গেলো আমার সেই শর্ত। তারা রাজিও হলো, বললো, 'ঠিক আছে, তরমুজ যদি টকটকে লাল না-হয়, তাহলে তোমাকে দাম দিতে হবে না' - তো সেই শর্তে ওজন করে কেনা হলো বেশ বড়সড় একটা তরমুজ। এবার তাদেরকে বললাম, “তাহলে এখন কেটে দেখাও যে ভিতরটা কি রকম লাল”- কিন্তু ও হরি !! কাটার পর দেখা গেলো, তরমুজের ভিতরটা প্রায় চালকুমড়ার মতোই সাদা, শুধু ধারের দিকটা একটু গোলাপী রংয়ের। এদিকে ধেড়ে মেক্সিকান বিক্রেতা ও তার সঙ্গীসাথীরা সবাই একযোগে “ওয়াও! ওয়াও!” রব তুলে সমস্বরে বলতে থাকলো “এর থেকে লাল আর তরমুজ হয় না, কি সুন্দর টমেটোর মতো লাল তরমুজ - দিন, এবার টাকা দিন...” - আমি কিছুটা থতমত খেয়ে গেলাম। ভাবলাম হয়তো আমার চোখের 'cone cell'-এর সংখ্যা ঝট করে কমে গেছে। চোখ কচলে ভালো করে নিজের গাড়ির দিকে তাকালাম - দেখলাম নাতো! লাল গাড়ির রং তো ঠিকঠাক লাল-ই দেখাচ্ছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আমি তাদেরকে বোঝাতে পারলাম না যে সেটা লাল তরমুজ নয়। অগত্যা কি আর করা - বুঝলাম তরমুজওয়ালা ব্যাটারা আইনস্টাইনের “থিওরি অফ রিলেটিভিটি” প্রয়োগ করতে শিখে গেছে। “যাহা আমার কাছে সাদা, তাহাই উহাদের কাছে টুকটুকে লাল”। সবই আপেক্ষিকতাবাদের লীলা খেলা। স্বর্গত: আইনস্টাইনের উদ্দেশ্যে গালাগালি করা ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই! অত:পর নগদ টাকা দিয়ে এক পেল্লায়, সাদা তরমুজ কোলে করে গাড়ীতে উঠলাম। বামফ্রন্ট জমানায় প্রচুর বাইরে-সবুজ-ভিতরে-লালওয়ালা তরমুজে-রাজনীতিবিদ দেখেছি - দিদির আমলে নিশ্চয় তারা এখন রং পাল্টিয়েছে, স্বভাব না পাল্টে। কিন্তু গিন্নীকে কি করে ভজাই আমি... তারই ফিকির খুঁজতে খুঁজতে গাড়ী স্টার্ট দিলাম!   

Sunday, November 24, 2013

একটি ওয়াশিং মেশিনের আত্মকথা

আমাদের বাড়িতে প্রথম আয়েশীয়ানার প্রচলন শুরু করে দেয় আমার মেজদা। চাকরি পাবার কিছু পরে পরেই মেজদা তার 'নিয়ন্ত্রিত' জীবনযাপন শুরু করে দেয়। রাত দেড়টা অবধি জেগে থেকে 'কলকাতা DD2 (মেট্রো)' চ্যানেলের বাংলা নাটকগুলোর সব ক'টা রিপিট টেলিকাস্ট দেখে তবে সে ঘুমোতে যেতো। যেদিন কোনো নাটক থাকতো না, সেদিন বারান্দার লম্বা বেঞ্চটাতে বসে বসে সে বাঁশি বাজাতে থাকতো। পাশে বসে থাকা বাড়ির  বিড়ালটা হতো তার একান্ত গুণমুগ্ধ শ্রোতা।  তেমন কোনো চেনাজানা সুর নয়, কিছুটা random, কিছুটা ভুল note-এ ঘুরেফিরে বেড়াতো তার দু'হাতের আঙুল গুলো। নিস্তব্ধ রাতে বাঁশির সেই অচেনা সুর  শুনতে খুব একটা খারাপ লাগতো না। মাঝে মাঝেই ঝিম ধরে আসতো। পরের দিন সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠতো অফিস যাবার ঠিক আধঘন্টা আগে - শুরু হতো প্রচন্ড ব্যস্ততা। আর ছুটির দিন হলে সে উঠতো, কিছু না-হলেও সকাল সাড়ে-ন'টার পরে। তারপর শুরু হতো তার একের পর এক বায়ানাক্কা - খবরের কাগজ কৈ, চা পেতে এতো দেরী হচ্ছে কেন, সকালের জল-খাবারে ডিম-সিদ্ধ নেই কেন, রেডিওটা কোথায় গেলো, বাথরুম খালি হচ্ছে না কেন, রোদ্দুরে বসার কোন জায়গা নেই কেন, বিড়ালটাকে খাবার দেওয়া হয়নি কেন, ইত্যাদি, ইত্যাদি। চা অবশ্য শুধুমাত্র ছুটির দিনগুলোতেই বানানো হতো, অন্যান্য দিনে চা-খাওয়া প্রায় নিষিদ্ধ ছিলো আমাদের বাড়িতে -  কোনো গেস্ট এলে অবশ্য এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটতো। চা-খাওয়া নিয়ে এতো কড়াকড়ির জন্যেই সেই ছোটোবেলা থেকে ওই চায়ের প্রতি একটা দূর্দম্য আকর্ষণ গড়ে উঠেছিলো - স্রেফ চা দিয়েই সব কটা রুটি খেয়ে ফেলেছি কতোবার। এমন কি আমাদের বাড়ির বেড়ালটা পর্যন্ত চায়ের বড়ো ভক্ত ছিলো। বহুবারই তাকে লোভে পড়ে ফেলে দেওয়া কষটা, চা-পাতা মুখে নিয়ে তারপর 'ওয়াক' তুলে ফেলে দিতে দেখেছি ! 

এই মেজদা শুরু করলো 'মূল্য ধরে' নিজের জামা-কাপড় অন্য কাউকে দিয়ে কাচানোর সিস্টেম। তখন 'ওয়াশিং মেশিন' বলে যন্ত্রটি আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে তেমন খ্যাবলা মেরে বসেনি। ছুটির দিনে কলতলায় বা পুকুর ঘাটের সিঁড়িতে বসে আছাড় মেরে মেরে জামা-কাপড় কাচা ছিলো যে কোন বাড়িরই একটা খুব কমন দ্বিপ্রাহরিক অ্যাক্টিভিটি, আর  একই সাথে খুব ইউসফুল এক্সারসাইজ। 'সানলাইট' আর 'সুপার-রিন' ছিলো আমাদের 'De facto' সোপ বার। আর ভারী ভারী, কম দামী জিনিস, যেমন শতরঞ্চি, কাঁথা, চাদর, বালিশের ঢাকনা, আসন, পর্দা, ইত্যাদি কাচার জন্যে বাবা কিনে আনতেন কাপড় কাচা সোডা-গুঁড়ো। একটা বড়ো ডিশের  হাঁড়িতে জল ভরে, তাতে সেই সোডা-গুঁড়ো ভালো করে মেশানো হতো। তারপর সেই হাঁড়ির মধ্যে সব কাপড়-চোপড় দিয়ে কম আঁচে উনুনে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখা হতো। একটা মোটা লাঠি হাঁড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে মাঝে মাঝে জিনিষপত্র গুলোকে উল্টে-পাল্টে দেওয়া হতো। এরপর সেগুলোকে নিয়ে পুকুর ঘাটে বসে থ্যাবড়া মেরে মেরে কেচে, ধুয়ে ছাদে নিয়ে গিয়ে মেলে দেওয়া হতো।   

তো মেজদা হঠাৎই একদিন স্থির করলো যে নিজের জামা-কাপড় আর নিজে কেচে 'সময় নষ্ট' করবে না। সেই সময়ে বরং কিছু 'ক্রিয়েশনাল' কাজ করবে - যেমন ধরা যাক ম্যাগাজিন বা কমিকস পড়া, লুডো-ক্যারাম খেলা, কাঁচি দিয়ে কাগজ কেটে কেটে অরিগ্যামি শেখা, শীতের রোদ্দুরে বসে খেঁজুর রস খেয়ে কেঁপে কেঁপে হু-হু করা, পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা, বাড়ির ছাদে টবেতে করে টমেটো, বেগুন, বা গাঁদাফুল গাছের চাষ করা, কিম্বা তেমন কোন কিছু করার না থাকলে নিছকই ঘুম, স্রেফ ঘুম। সেই মতো কাচার পারিশ্রমিক ঠিক হলো - যতদুর মনে পড়ে জামা-পাজামার জন্যে ৭৫ পয়সা, আর প্যান্টের জন্যে ১ টাকা বা ১ টাকা ২৫ পয়সা ধার্য্য করা হয়েছিলো। বাড়ির কাজের মেয়েটি ছাড়াও আমি আর আমার ছোটদি, অর্থাৎ যারা তখনো বেকার ছিলো, তারা সাধারনত এ ধরনের সাপ্তাহিক, টেম্পোরারী  Job offer-এ ভালোই রেসপন্ড কোরতাম। 'ঝোপ বুঝে কোপ মারার মতো' তাল বুঝে কখনো কখনো আমরা বিড করে করে রেট দিতাম বাড়িয়ে। স্পেশালি যেদিন গুলোতে কোন ওয়ান-ডে ক্রিকেট থাকতো, বা বাড়িতে কোনো আত্মীয় আসতো, বা খুব জোরে বৃষ্টি শুরু হতো, বা রবিবারের দুপুরের টিভিতে আঞ্চলিক সিনেমার ন্যাশনাল প্রোগ্রামে কোনো ভালো বাংলা সিনেমা থাকতো। জামা-কাপড়ের সংখ্যা বেশি থাকলেও রেট যেতো বেড়ে, কারণ আমাদের নিজের জামা-কাপড়ও আমাদেরকেই কাচতে হতো। মাঝে মাঝে মেজদাকে রেট বাড়ানোর পরেও 'প্যাকেজড ডীল' হিসাবে এক্সট্রা আরও কিছু দিতে হতো! 

কাপড়-জামা কেচে ধুয়ে, পুকুরে স্নান করে যখন উঠে আসতাম তখন হাত-পায়ের আঙ্গুলের চামড়া গুলো দেখতাম কিছুটা ফুলে ফুলে গেছে। কিন্তু সেই 'উপরি' পাওনার লোভে খুব একটা মাইন্ড করতাম না। বাড়ির কিছুদুরেই কয়েকটা ধোপা বা লন্ড্রীর দোকান ছিলো। তাদের রেটও খুব সম্ভবত এই একই রকমের ছিলো। কিন্তু মেজদা কেন যে আমাদেরকেই প্রেফার করতো, তা এখন মাঝে মাঝে বসে ভাবি। হয়তো 'same day shipping'-এর কনসেপ্ট - কি হয়তো বা নিজের ফ্যামিলির মধ্যেই investment-কে  সীমাবদ্ধ রাখা - কে জানে !!  শরৎচন্দ্রের 'শ্রীকান্ত' উপন্যাসের 'মেজদা'-র সাথে আমার মেজদার চরিত্রের বেশ কিছুটা মিল ছিলো। মাঝে মাঝে মনে হয় 'বাড়ির মেজদারা' বোধহয় সব ঐরকমই হয় !! 


একান্নবর্তী ফ্যামিলি আজ বহুদিনই চলে গেছে বিলুপ্তির পথে। যে'কটা এখনো কোনরকমে জোড়া-তালি দিয়ে টিকে আছে, মনে হয়না এমন মজার ঘটনা আজও কোথাও ঘটে চলেছে। ফ্রি-টাইম বলে আজকাল আর মানুষের কিছু নেই - সবাই কিছু না কিছু নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। সোফা-টিভি-ফ্রিজের মতো ঘরে ঘরে আজকাল অ্যাকোয়াগার্ড, ওয়াশিং মেশিন, কম্পুটার আর ট্যাবের ছড়াছড়ি। কোন কোন বাড়িতে আবার একাধিক সংখ্যায়ও এদের দেখা যায়। ডিশ-ওয়াশার কিম্বা ভ্যাকুয়াম ক্লীনারও আজকাল নাক-উঁচু কোন কিছু নয়। 'রোটি-মেকার' বলে আরেক যান্ত্রিক-প্রজাতিও সম্প্রতি ঘরে ঘরে হানা দিয়েছে। এ সবই হয়তো মানুষের জীবনকে আরও বেশি করে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ভরিয়ে তুলেছে, কিন্তু একই সাথে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসাও হু-হু করে কমিয়ে দিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে খুব দ্রুত হারে  বদলে যাচ্ছে সেই চির-চেনা মায়াবী পৃথিবীটা। একে-অপরের প্রতি নির্ভরশীলতা হারিয়ে আমরাও যেন হয়ে উঠছি দিনের পর দিন আরও, আরও বেশি করে  'প্রায়-যন্ত্র' একেকটা সব মানুষ।       

Tuesday, November 19, 2013

ছেঁড়া ঘুড়ি, রঙিন বল, এইটুকুই সম্বল...

অবশেষে শীত এলো এদেশে, সাথে নিয়ে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। প্রথম প্রেমের মতোই, প্রথম শীতের ধাক্কায় যথারীতি হাবুডুবু খাচ্ছি আমি। ঠান্ডা লেগে জ্বর-জ্বর ভাব, মাথা ভোঁ-ভোঁ শুরু হয়েছে, স্মার্ট মনিটরে ফুটে ওঠা source code গুলোকে দেখে মনে হচ্ছে সব কালো কালো স্মার্ট পিঁপড়ের দল  - দিব্যি হেসে-খেলে, নেচে-গেয়ে বেড়াচ্ছে। 'লোহা লোহে কো কাটতা হ্যায়' - সুতরাং গব্বরের মতো এই শীতকে কাবু করতে আমার চাই আরেকটা শীতল কোন কিছু। তবে এই মুহুর্তে হাতের কাছে 'শীতের গান' ছাড়া অন্য কিছুতে ভরসা রাখতে পারছিনা। 

শীতের গানের কথা ভাবলেই মাথায় প্রথমে আসে আশা ভোঁসলের গাওয়া সেই গানটা: "একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও, তাতে আগুন পাবে..." - এরকম witty অথচ meaningful গানের কথা খুব একটা দেখা যায় না। এই গান শীতকালের না-হয়ে যেতেই পারে না। নির্ঘাৎ কোনো এক শীতের সকালে গানের গীতিকার প্রাত:কালীন প্রেশার আনতে গিয়ে হাতের কাছে কোনো দেশলাই না-খুঁজে পেয়ে, চরম আক্ষেপে এটি লিখে ফেলেছিলেন। পরে একটু সেন্টিমেন্টাল রং-টং চড়িয়ে প্রেমের গান হিসাবে দিব্যি চালিয়ে দিয়েছেন। গানের মধ্যে দেশলাই কাঠি জ্বালানোর সেই 'ফসসজজসস....' আওয়াজ দেওয়ার বুদ্ধিটা যার মাথা থেকে বেরিয়েছে তিনিও এক 'নমস্য ব্যক্তি' - তবে আমি শিওর সেই ব্যক্তি কোনমতেই R. D. Burman নন - most probably স্বপন চক্রবর্তী, যিনি  R. D. সাহেবের গানের 'Interlude Music' গুলো কম্পোজ করতেন। গানের মুখড়ার কয়েক লাইন পরে যখন আশা-দি সুরের চড়ায় উঠে গিয়ে বলেন: "তবুও, আমায় তুমি পাবে না, আমায় তুমি পাবে ন-ন্যা..." শুনে মনে হয় এরকম একটা আগুনে-প্রেমিকা থাকলে ভালোই হতো। প্রেমাগুন দিয়ে at least শীতকালের হীটারের খরচ কিছুটা কমানো যেতো ! 
এই দেশলাই কাঠির কথাতেই মনে পড়ে গেলো ছোটবেলায়, যখন ফোর কি ফাইভে পড়ি তখন একটা হুজুক উঠেছিলো, যেটা ক্রমশই সংক্রামক ব্যাধির চেহারা নিয়েছিলো, সেটা হলো দেশলাই বাক্সের কভারগুলো জমানো। পুরানো পিচবোর্ডের মলাট লাগানো খাতার পাতাতে গঁদের আঠা দিয়ে লাগানো হতো এই সব কভারগুলো। কখনো কখনো আমরা ডুপ্লিকেট কভারগুলোকে অন্যের সাথে ট্রেড করে নিতাম। বাড়িতে যখন বাবা দিনের পর দিন সেই একই, বোরিং লাল 'জাহাজ মার্কা' দেশলাই নিয়ে আসতেন, তখন কি রাগ আর বিরক্তি হতো। বলতাম: 'অন্যের বাবারা তো কত নানান ধরনের দেশলাই কেনেন - তুমি কেনো না কেন?' - বাবা মুচকি মুচকি হাসতেন আর বলতেন 'আচ্ছা, আচ্ছা হবে - নেক্সট টাইমে ঠিক হবে' - তো সেই নেক্সট টাইম আর সহজে আসতো না। আমাদের পুকুরের অন্যদিকের বাড়ির অধিকারীদের ছেলেটা আবার এইসব কভার লুকিয়ে লুকিয়ে বিক্রি করতো। কভার যত রেয়ার হবে, দাম তত বেশী। আমি কিছু না হলেও at least গোটা ত্রিশেক কভার তার কাছ থেকে কিনেছিলাম। যখের ধনের মত আগলে রাখতাম এই কভার গুলোকে। ইস্কুলে নিয়ে গেলেও টেনশান, কেউ যদি নিয়ে নেয়, বিশেষ করে স্যারেদের চোখে পড়লে তো আর রক্ষা নেই। আবার না নিয়ে গেলেও প্রেস্টিজ পুরো পাংচার,  দেখাতে হবে না, যে কতোগুলো জমলো আমার। পরীক্ষায় কিছু নম্বর কম পেলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু দেশলাই কালেকশনে যদি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে টপকাতে না পারি, তো ফ্রাষ্টু খাওয়ার চোটে কেস দফারফা। ছাতা, মোটর গাড়ি, মশাল, জাহাজ, পিস্তল, বরফি, লাট্টু, নৌকা, তাসের হরতন, রাজা, ঘন্টা... আরো কত্তো নানান ব্র্যান্ডের দেশলাই কভার হতো সেই সময়। একসময় কোত্থেকে ধুয়ো উঠলো যে চারশ'টা ইউনিক কভার জমা দিলে একটা রেডিও, না টিভি ফ্রী-তে পাওয়া যাবে। শুনে আমাদের সে কি উত্তেজনা - বাড়ির বড়োদেরকে দিয়ে দেশলাই কেনানোর হিড়িক পড়ে গেলো। কারোর মাথাতে একবারও এলোনা যে কোথা থেকে সেই প্রাইজ দেওয়া হবে, কারা প্রাইজ দেবে, কেনই বা দেবে, সে'সব ডিটেলস ভেরিফাই করানোর কথা!! দেশলাই বাক্স দ্রুত শেষ করানোর জন্যে আমি মাঝে মাঝে মায়ের চোখের আড়ালে দেশলাই বাক্স থেকে এক গোছা কাঠি তুলে নিয়ে উনুনের মধ্যে ফেলে দিতাম। মুহুর্তের মধ্যে আগুনের এক ঝলকে, দপ করে জ্বলে উঠে শেষ হয়ে যেতো তারা। তারপর নিজেই বলতাম যে একটা দেশলাই কিনে আনবো? মা শুনে অবাক হয়ে বলতেন 'এই তো সেদিন স'বে মাত্র একটা বার করলাম !!'


আবার কখনো কখনো কয়েকটা আস্ত দেশলাই বাক্স একসাথে নিয়ে, তাদেরকে পাশাপাশি রেখে, ইলাস্টিক-ব্যান্ড (গাডার) দিয়ে আটকে পিস্তল বানিয়ে খেলাও বেশ পপুলার ছিলো - বিশেষ করে কালীপূজার সময়ে। টিনের বা মেটালের তৈরী ক্যাপ-পিস্তল তখন এতোটা সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি, অন্তত সাধারণ মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে তো নয়ই। যতদূর মনে পড়ে অর্ডিন্যারি দেশলাইগুলোর দাম ছিলো পনেরো পয়সা, আর যদি মোমের-কাঠি হয় তো দাম কুড়ি, কি বড়জোর পঁচিশ পয়সা ! মোমের দেশলাই বাক্সগুলো ছিলো আকারে একটু ছোট, কাঠিগুলো বেশ মসৃণ ধরণের, আর জ্বলতোও অনেকক্ষণ ধরে। একবার রবিবারের সকালে বাবার সাথে বাজার করতে গিয়েছি - বাবা তার এক পুরানো বন্ধুর সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। হঠাৎ সেই বন্ধুটি পকেট থেকে দেশলাই বের করে ফস করে জ্বেলে একখানা সিগারেট ধরালেন। আমি তো তাঁর হাতের সেই অনামী ব্র্যান্ডের দেশলাইখানা দেখে ঈর্ষায় বেশ জ্বলছি। একসময় আর থাকতে না পেরে, শেষমেষ বলেই ফেললাম: 'কাকু, দেশলাইটা আমায় দেবেন ?' - আমার একথা শুনে তিনি তো বটেই, এমনকি বাবা পর্যন্ত হা-হয়ে গেলেন। আমি বেগতিক দেখে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম : 'না মানে, আসলে দেশলাইয়ের কভার জমাই তো, খাতায় আঠা দিয়ে সব আটকে রাখি। আপনার দেশলাইটা আমার কাছে নেই, তাই পেলে ভালো হয়  - তাহলে বোধ হয় আমার দু'শোটা কমপ্লিট হয়ে যাবে' - সেদিন বাড়িতে ফিরে এসে যা বকা খেয়েছিলাম !!!

অবশ্যম্ভাবী পরিণতি রাস্তায় মুখ গুঁজে, শকুনের নজরে চলা। বিশেষত বাজার কিংবা বাসষ্ট্যান্ড এলাকাগুলোতে। পাঁক-কাদা, কফ-থুথু, পান-গুটকার পিক, হিসি, গোবর – কোন আনহাইজেনিক বর্জ্য পদার্থের সাধ্যি ছিলোনা আমাদের দেশলাই অন্বেষণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর। একহাতে নাক ঢেকে অন্য হাতে কাঠি দিয়ে নেড়ে-চেড়ে  দেশলাইবাক্স খোঁজার কাজে আমাদের জুড়ি ছিলো না। পরীক্ষার শেষে বা পুজোর ছুটিতে কখনো বাইরে বেড়াতে গেলে, বন্ধুরা আগে থেকে সব অগ্রিম বুকিং দিয়ে রাখতো - আমিও তাই করতাম। একবার পুরীতে বেড়াতে গিয়ে আনন্দে দশখানা হয়ে বড়দের চোখ এড়িয়ে, রাস্তাঘাট থেকে জমিয়ে কতো যে দেশলাই কুড়িয়েছি, কিনেওছিলাম অনেককটা। এমনও হয়েছে, একই দোকান থেকে তিন-চার রকমের দেশলাই কিনে দোকানদারের চোখ ছানাবড়া করে দিয়েছি। 

গতবছরে দেশে ফিরে মায়ের ঘরের পুরানো কাঠের বাক্সটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎই পেয়ে গেলাম, বা বলা ভালো আবিষ্কার করলাম পুরানো দিনের সেই প্রিয়, অতি-প্রিয় দেশলাই-জমানোর খাতাটা। ক্লাসে এইটে ওঠার পর থেকে ওটার প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমে গিয়েছিলো। দীর্ঘ পঁচিশবছরের সময়ের ভারে, বয়সের চাপে, অনাদরে অবহেলায় মায়ের মতোই সে এখন হয়ে উঠেছে মলিন বিবর্ণ, ধুলোর আস্তরণে হয়ে উঠেছে আরও পুরু। হঠাৎ করে খাতাটার জন্যে বড়ো মায়া হলো - সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়া আবেগগুলো এক ঝটকায় উদ্গারিত হলো যেন। কতো-কি স্মৃতি মনে পড়ে গেলো ! ছেলেবেলার বকুনি খাবার কথা, স্কুলের নানান দৌরাত্ম্যির কথা, বন্ধুদের সাথে মিলে করা হাজার কান্ড-কারখানার কথা - মা-বাবা, দাদা-দিদিদের কথা, যারা দিনের পর দিন আমাকে নি:স্বার্থে ভালোবেসে, হাজার ঝক্কি সামলিয়ে মানুষ করে তুলেছিলেন। হঠাৎ কি জানি হলো, জলভরা চোখে আমি দেখলাম সেটাতে আর এক ফোঁটাও ধূলো জমে নেই - প্রথম যৌবনের প্রেমিকার মতোই তরঙ্গিত, অসাধারণ মায়াকাড়া রূপ হয়ে উঠেছে তার। শৈশব আর কৈশোরের স্মৃতিতে আচ্ছন্ন সেই খাতার ধুলোর আবরণ ঝেড়ে-পুঁছে, পাতায় আটকানো দেশলাইয়ের কভারগুলোর গায়ে খুব ধীরে ধীরে, পরম স্নেহে হাত বোলাতে লাগলাম। আর কি অদ্ভুত! তাদের গায়ে লেগে থাকা ছোটবেলার মন-কেমন করা সেই অতুলনীয় 'ম-ম' গন্ধটা যেন আবার অনুভব করলাম... অনেক, অনেক দিনের পর। 

রেডিওতে চাপা স্বরে তখন বেজেই চলেছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মোহময় গলায় হারানো দিনের সেই রোমান্টিক গান: 'তুমি এলে, অনেকদিনের পরে যেন বৃষ্টি এলো...'




2014 সালে ক্যালিফোর্নিয়া বে-এরিয়ার "পশ্চিমী" পুজা সংগঠন থেকে দূর্গাপুজা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হওয়া  'অঞ্জলি' পুজা-ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিলো আমার এই আর্টিকেলটি। 
                                          এইখানে দেওয়া হলো সেই গল্পের লিঙ্কটি   


Monday, November 18, 2013

Bjarne Stroustrup-র C++ বই

"Certainly not every good program is object-oriented, and not every object-oriented program is good..." - Bjarne Stroustrup 

আজ থেকে বছর কুড়ি আগে স্টারদেরকে সবাই তাঁদের পুরো, ভদ্রস্থ নামেই ডাকতো - সে তিনি যে বিষয়েরই হোন না কেন। যেমন কপিলদেবকে সবাই কপিলদেব-ই বলতো, কাউকে বলতে শুনিনি যে "K. N." - বা উত্তমকুমারকে অন্য কোনো নামে কাউকে ডাকতে শুনিনি কখনো। 'হেমন্ত মুখোপাধ্যায়' চিরকালই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নামেই পরিচিত ছিলেন - এমন কি 'হেমন্ত মুখার্জী' নামেও তাঁকে ডাকতে খুব কমই শুনেছি। একবার পূজার বাজারে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের HMV থেকে বার হওয়া নতুন গানের রেকর্ড কিনতে গিয়ে: "দাদা, সন্ধ্যার নতুন রেকর্ডটা কি আছে?" বলাতে যোধপুর পার্কের 'দ্য মেলোডি' রেকর্ড স্টোরের কাউন্টারে বসা সেই বয়স্ক লোকটি ব্যাঙ্গাত্মক সুরে তিরস্কার করেছিলেন: 'সন্ধ্যা কি আপনার বন্ধু হয় নাকি ?' - জীবনে দ্বিতীয়বার আর সেই একই ভুল করিনি। এখনো সেই LP রেকর্ডের শিরোনামটা মনে আছে: 'নতুন গানের, রঙীন খামে' 

কিন্তু আজকাল হলো গিয়ে সব 'শর্টের' যুগ। মানুষের হাইট গেছে কমে, মিনি-স্কার্টের ঝুল কমতে কমতে হয়ে গেছে রুমাল, উর্ধাঙ্গের পরিধেয় বস্তু দেখলে মনে পড়ে সেই প্রবাদ: 'কেউ পরে অভাবে, কেউ পরে স্বভাবে' ! আর বিশ্বাস, সততা, এ সবের কথা না-বলাই ভালো। শচীন তেন্ডুলকার হয়ে গেছে 'SRT' - শাহরুখ খান হয়ে উঠেছে 'SRK' - সিনেমার নামগুলো তো আরও ফানি। 'QSQT' যে আমির খানের টসটসে প্রেমের ছায়াছবি, সেটা না জানায় সুদুর অতীতে আমাকে অনেক অপদস্থ হতে হয়েছিলো। কয়েকদিন আগেই বাড়ি ফেরার পথে প্রচন্ড ট্রাফিক জ্যামে পড়েছিলাম। তিন লেনের এক্সপ্রেস রোডের কোথায় একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে সেটা একটাই লেন হয়ে গেছে। 'ন-যৌ-ন-তস্থৌ' হয়ে চারিদিকে মগনলাল মেঘরাজের কথা মতো 'সব লালে-লাল' দেখছি। রাস্তাটা যে এতো গাড়ি বয়ে নিয়ে চলে সেটা আগে কখনো মনে হয়নি। জীবনে শর্টকাটের যে কি প্রয়োজন তা আবার অনুভব করলাম। কিন্তু কোথায় নিই শর্টকাট !  রাস্তা তো পুরো পার্কিং লট হয়ে আছে! চরম bored হয়ে বসে বসে ভাবছিলাম যে আমার জীবনে শর্টকাটওয়ালা কোন বস্তু বা মহাপুরুষের আবির্ভাব কখনো হয়েছিলো কিনা। স্মৃতি মানুষকে যে কতখানি প্রতারিত করতে পারে, তা আবার নতুন করে জেনে বিস্মিত হলাম। মনে পড়ে গেলো আমার জীবনের প্রথম কর্মস্থলেই এক কলিগকে আমরা ডাকতাম তার শর্টকাট নামে, 'SJD' (পুরো নামটা এখানে বলা ঠিক হবে না !)  - সে'কথাটা বেমালুম ভুলে গেছিলাম। এই SJD নাম মনে করার সাথে সাথেই একরাশ হাসির ঘটনা মনে পড়ে গেলো। তাদের সব থেকে মজারটার সাথে জড়িয়ে আছেন C++ ল্যাঙ্গোয়েজের জন্মদাতা Bjarne Stroustrup মহাশয় স্বয়ং। 

সে সময় Java ল্যাঙ্গোয়েজ এতোটা পপুলার হয়নি - বিল গেটস মনোপলিতে ভালোমতোই ডলারের পাহাড় বানিয়ে চলেছিলেন। C++ আর MFC জানা লোকেদের তখন প্রচুর ডিমান্ড। এই সময় দিল্লী, না বোম্বে-র TCS থেকে একজন বিজ্ঞ ছেলে এসে জয়েন করেছিলো আমাদের অফিসে, আমাদের থেকে মাস খানেক আগে। তাকে না-জানি কেন 'পানু' নামে ডাকা হতো। এখানেও সেই শর্টকাট নাম। তবে মিথ্যা বলবো না, সে মোটেই ঐসব 'নীল সিনেমা'-টিনেমা দেখতো না। কিন্তু নিক-নেম তো আপনা-আপনিই জন্ম নেয়, অনেকটা আগাছার মতো এবং বেশিরভাগ সময় কোনো কারণ ছাড়াই। তো এই পানুর কাছে ছিলো Stroustrup-এর লেখা অরিজিনাল বই "The C++ Programming Language"  --- এই বই নাকি  C++-এর প্রথম ও শেষ কথা। এটা ধুয়ে তার জল খেলেও নাকি গোটা IT জগৎ চলে আসবে আমাদের হাতের মুঠোয়, সিনিয়ররা মাথার মধ্যে এরকম ভাবনাই ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু বইটা ছিল বিদেশী - Addison Wesley থেকে পাবলিশড হতো আর দামও ছিল অনেক বেশি - ইন্ডিয়ান টাকায় তখনকার দিনেও প্রায় সাতশো টাকার মতো। সে সময় ইন্টারনেট থেকে বই ডাউনলোডের কোনো কনসেপ্টই ছিলো না। তার উপর আমরা ছিলাম ঘোর অর্থ-সংযমী ব্যাচেলর, বই 'কিনে পড়ায়' কখনোই বিশ্বাস কোরতাম না। যাদবপুরের এইট-বি বাস স্ট্যান্ডের রামকৃষ্ণদার জেরক্সের দোকান তখন আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছিলো, বা উল্টোটা, আমরা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম তাঁকে। আমরা রোজ দেখতাম পানু অফিসে এসে নিজের ডেস্কে বসে বসে গম্ভীরভাবে সারাক্ষণ ওই খটমট বইটা পড়ে যাচ্ছে - কারুর সঙ্গে তেমন কথাটথা সে বিশেষ বলতো না। আমরা যখন কম্পিউটারে বসে আমাদের রোজকার ফুটবল গেমস খেলতে খেলতে চেঁচামেচি শুরু করে দিতাম, তখন সে অতি-বিরক্ত চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে, শ্রাগ করে কনফারেন্স রুমে চলে যেতো, আর দরজা বন্ধ করে সেখানে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সেই বইটা পড়ে যেতো। আমরা ভাবতাম না-জানি সে ক-তো জ্ঞানী। অনেকবারই তার কাছে Stroustrup-এর সেই বইটা পড়বো বলে চেয়েছি, কিন্তু তার সেই একই কথা: 'না ভাই, আমি বই বাড়ি নিয়ে যেতে দিই না - তুমি অফিসে বসেই অফ টাইমে পড়ো না  কেন ?' -  আমরা আমতা আমতা করি, আর মনে মনে বলি: "শালা !! আধুনিক পাগলা দাশু এসেছে কোথাকার !!  অফিসে এসে বই পড়লে খেলবোটা কখন? আর বই 'কিনে কেন' পড়বো শুনি? তাহলে জেরক্সের দোকানগুলো রয়েছে কি করতে !!"  - পানু ছিল মহা সাবধানী - লাঞ্চে যাবার সময় নিজের ব্যাকপ্যাকের মধ্যে বইটা ঢুকিয়ে তবে সে খেতে যেতো। বইটা যেন ছিল তার নন-লিভিং এক প্রেমিকা - মুহুর্তের জন্যেও সে তাকে নজর-ছাড়া করতে চাইতো না। 

এই রকম ভাবেই  চলছিলো - মাসখানেক বাদে একদিন SJD জয়েন করলো, একটা জাপানি প্রজেক্টে কাজ করার জন্যে। পানু সহ আমরা কয়েকজন অলরেডি সেই প্রজেক্টে কাজ শুরু করে দিয়েছি  - পানু ছিলো আমাদের স্বঘোষিত টিম লীড। SJD ছিলো আমাদের থেকে সামান্য বড়ো, কিন্তু ফিচকে। সেও বোধহয় কোনো একটা TCS থেকেই এসেছিলো। তো কিছুদিনের মধ্যেই জানা গেলো SJD আমাদের থেকে 'একটু বেশি C++ জানা' প্রোগ্রামার। সুতরাং অচিরেই সে হয়ে উঠলো 'বেশ মূল্যবান' বস্ত। আমরা সবাই তার ভালো বন্ধু হবার চেষ্টা করতে লাগলাম - এমনকি পানুও। দেখলাম, এই হচ্ছে মোক্ষম সুযোগ, একদিন আমরা SJDকে সব খুলে বললাম। তার কাছেও সেই মহার্ঘ্য বইটা ছিলো না - দেখলাম সেও আমাদের মতো অর্থ-সংযমে বিশ্বাসী - আর হবেই-না বা কেন, সেও ছিল আমাদের মতো কলকাত্তাইয়া বাঙালি। সুতরাং সে নিমিষেই রাজি হয়ে গেলো। SJD কিছুদিন পানুর সাথে ভালো ব্যবহার করে করে তার কিছুটা বিশ্বাস অর্জন করলো।  তারপর এক শুক্রবারের সন্ধ্যায় সে পানুর কাছে ওই বইটি উইকেন্ডে বাড়িতে নিয়ে পড়ার জন্যে আব্দার করে বসলো। পানু না-না-না করতে গিয়েও আর না-করতে পারলো না। বাস্তবিকই তার C++ জ্ঞান ছিল লিমিটেড। সুতরাং SJDকে হাতে রাখার জন্যে সে বইটা ধার দিতে রাজি হয়ে গেলো। তবে সে কিন্তু SJDকে দিয়ে বার বার 'কিরা কাটিয়ে' নিলো যে তার সেই বিশ্বাসের অমর্যাদা যেন না-হয়, অর্থাৎ সেই বই যেন কোনোভাবেই SJD-র কাছ থেকে হাতছাড়া না-হয়। SJD সহ আমরা সবাই থাকতাম দক্ষিণে আর পানু থাকতো উত্তরে। সুতরাং আমদের অফিস বাস ছিলো আলাদা আলাদা। ফেরার সময় বাস আমাদেরকে ড্রপ করে দিতো যাদবপুর পর্যন্ত। তো সেই রাতে যাদবপুরে নেমে আমরা সোজা দৌড়ালাম রামকৃষ্ণদার জেরক্সের দোকানে। সেখানে পাক্কা দু-ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে সেই মোটা ধুমসো বই জেরক্স করা হলো - উইথ multiple copies !!! বাড়ি ফিরলাম হে-ভ-ভি খোশ মেজাজে - একে তো ৭০০ টাকার বই যোগাড় করেছি মাত্র ৩০ টাকাতে, তার উপর পানুর বইয়ের ওপর আচ্ছা বাটপাড়ি করা গেছে !! সেটা ভেবে আরও মজা লাগলো। এখন ভেবে দেখলে অবশ্য বেশ খারাপই লাগে - কিন্তু সেই সময়ে একটুর জন্যেও মন খারাপ করে নি। মানুষ বোধ হয় সময়ের সাথে সাথে বদলিয়েই যায়। 

নেক্সট সোমবার আমরা অফিসে ঢুকলাম বেশ আলাদা আলাদা ভাবে - এমন ভাব করলাম যে SJDকে আমরা তেমন চিনিই না। যথারীতি পানু নিজে এসে SJD-র কাছ থেকে বইটা চেয়ে নিলো। আমরা তো প্রমাদ গুনছি - কম্পুটারের স্ক্রিনের দিকে মুখ করে, গম্ভীর ভাবে কোনমতে হাসি চেপে বসে আছি, ভাবখানা এমন যেন NASA-র কোনো ইম্পর্টান্ট প্রজেক্টে কাজ করছি। কয়েক মুহূর্ত বাদেই পানুর গলা শোনা গেল: 'SJD, একটু শোনো তো' - কাঁচের রিফ্লেকশনে দেখতে পেলাম পানু SJDকে নিয়ে কনফারেন্স রুমে ঢুকে দরজা টেনে দিলো। ঘষাটে কাঁচের দরজার ওপাশে SJDকে দেখা গেলো ক্রমাগত হাত-পা নেড়ে নেড়ে কি-সব বলে চলেছে। আমি হাসি আর চাপতে না পেরে সোজা রেস্টরুমের দিকে হাঁটা দিলাম। 

কিছুক্ষণ বাদে ফিরে এসে দেখলাম পানু আর SJD দুজনেই ভাসুর-ভাদ্র-বৌ-এর মতো দু'জন-দু'দিকে গম্ভীর মুখ করে বসে আছে, কেউ কাউকে চেনে বলে মনে হচ্ছে না। আমার দিকে চোখ পড়তেই SJD-র পাতলা গোঁফের তলায় লুকানো হাসিটা খন্ড সেকেন্ডের জন্যে ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেলো। বাকি দিনটা আমরা সবাই হিন্দী সিনেমার 'মনোজকুমার'-এর মতো নাকে-মুখে হাত চাপা দিয়ে, জটিল ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকার ভাব দেখিয়ে কোনোরকমে কাটিয়ে দিলাম। বিকেলে ফেরার পথে আমরা 'মাসির দোকানের' সামনে বসে SJD-র মুখে তাদের সেই কথোপকথনের রিপ্লে শুনলাম। পানুর 'সত্যি কথাটা তুমি আমায় বলো একবার...'-এর কাতর অনুযোগে SJD নাকি প্রথমে শুরু করেছিলো 'বই পড়তে পড়তে খোলা অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আর পা-টা বোধ হয় বই-এর উপরে চলে গিয়েছিলো' - কিন্তু সেটা শোনাতে পানু আঁতকে ওঠে, তারপর নাকি কাউন্টার প্রশ্ন করে যে বইয়ের বাইন্ডারের দিকে এতো ভাঁজ কিসের, আর কালো-কালো ছোপগুলোই বা এলো কোত্থেকে? তখন SJD বলে যে মেসের ঘরের পশ্চিমের জানলা দিয়ে বিকেলের দুষ্টু রোদ্দুর এসে এসে ঐসব করে দিয়েছে। পানু সেই ভুলভাল যুক্তি সেদিন খেয়েছিলো বলে আদৌ মনে হয় না, কিন্তু SJD নাকি এর আগে জীবনে কখনো, একটা সিঙ্গেল সেশনে এতো বার করে 'বিশ্বাস করো, বিশ্বাস করো...' বলেনি।  
~~~   ~~~   ~~~

Java আজ C++এর বাজার ভালোই খেয়ে নিয়েছে। Stroustrup-এর সেই বইও আজ আর C++এর 'De facto বই' বলে অনেকেই মনে করে না। Given a chance শুধু আমি কেন, বেশিরভাগ লোকই আজকাল C++ নিয়ে আর কাজ করতে চায় না। Java made our lives much easier, as well as  richer - Open Sourceকে আঁকড়ে ধরে জীবনযুদ্ধে আমরা যে যার মতো বিভিন্ন দিকে ছিটকে গিয়েছি। আজ তারা দু'জনে কে কোথায় আছে কোন আইডিয়া নেই - তবে জানতে খুব ইচ্ছা হয় যে এখনো পানু SJDকে, কিংবা আমাদেরকে ক্ষমা করেছে কি না...


Sunday, November 17, 2013

জীবনের প্রথম প্যারাবোলা...

কিছুদিন আগে এক টিম লাঞ্চে কথা হচ্ছিলো কার কি ফেভারিট জিওমেট্রিক শেপ তাই নিয়ে। ফেভারিট শেপ দিয়ে নাকি মানুষের পার্সোনালিটি গেস করা যায়। বেশিরভাগই বলছিলো 'স্কোয়ার', 'সার্কেল', 'রেক্টাঙ্গল' বা 'ট্রায়াঙ্গল' - কে একজন বললো 'স্কুইগেল' - আমাকে জিজ্ঞাসা করতেই আমি ইনস্ট্যান্টলি জবাব দিলাম 'প্যারাবোলা' - সবাই কিছুটা হকচকিয়ে গেলো। কারনটা কি জানতে চাইলে যুতসই কোনো জবাব খুঁজে পেলাম না। বেসিক্যালি আমার অবচেতন মনই এই উত্তরটা সাজেস্ট করেছে। কিন্তু সেটাকে সাপোর্ট করার মতো সাফিসিয়েন্ট যুক্তি তার কাছে সঙ্গে সঙ্গে আশা করা যায় না। তাই কায়দা করে বললাম নেক্সট কোনো একদিন কারনটা বলবো। সবাই ভাবলো না-জানি কি গূড় কারণ সেটা ! সারাটা দিন নানান ব্যস্ততায় কেটে গেলো - মিটিংয়ের পর মিটিং। কিন্তু মাথার ভিতর ঘুনপোকার ঘ্যানঘ্যানানির মতো রয়েই গেল প্রশ্নটা। সত্যি তো, এতো কিছু শেপ থাকতে হঠাৎ 'প্যারাবোলা' বলতে গেলাম কেন? রাতে ঘুম আসতে ইদানিং আমার এমনিই সময় বেশি লাগে, সেই রাতে ঘুম এলো অনেক পরে। ভোরের দিকে ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্নের একগাদা অসংলগ্ন, খন্ড খন্ড ঘটনাবলীর মধ্যে দিয়ে বোধহয় জানতে পারলাম সেই আসল কারণটা ছিলো কি। 

আমার ছোটবেলাতে ইন্টারনেট, বা ভিডিও গেমসের প্রাদুর্ভাব ছিলো না। কিন্তু অজস্র মজার মজার খেলা ছিলো - এর মধ্যে আমার অন্যতম, বা হয়তো সব থেকে ফেভারিট ছিলো শীতকালে, অ্যানুয়াল পরীক্ষার শেষে 'ঘুড়ি ওড়ানো ' - একটা কেটে যাওয়া ঘুড়ি পাওয়ার থেকে বেশি আনন্দ যে কোনো কিছুতে থাকতে পারে, তা আমার জানা ছিলো না। সে সময়ে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আমি বাড়ির উঠানে এসে আকাশটাকে দেখে নিতাম। হাওয়াহীন, নিস্তব্ধ সকালবেলা দেখলেই আমার গা-পিত্তির জ্বলে উঠতো। ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে একটানা আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সান-বার্নের কারণে চোখ-মুখের চেহারাই যেতো বদলে। বিশেষ করে ঠোঁট ফেটে রক্ত বার হওয়াটা খুব কমন একটা ব্যাপার ছিলো। মা-পিসিমা সহ বাড়ির বড়োরা অনেকেই এই সময়ে আমাকে ল্যাজওয়ালা সেই পপুলার প্রাণীটার সাথে অহেতুক তুলনা করতো। 

ঘুড়ি ওড়ানো, প্লাস ঘুড়ির প্যাঁচ লড়াইয়ের যাবতীয় কৌশল আমার মেজদার কাছ থেকে শেখা। বিকেল গড়িয়ে গিয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত পশ্চিম আকাশে সূর্যের লাল আলোর সামান্য প্রভাটুকু লেগে থাকতো, ততক্ষণ অবধি আমরা ঘুড়ি উড়িয়ে চলতাম। কখনো কখনো এমনও হয়েছে যে আকাশে চাঁদ উঠে গিয়েছে, সেই চাঁদের আলোতেও আমরা চাদর গায়ে দিয়ে, মাফলার পরে ঘুড়ি উড়িয়ে চলেছি। তবে অধিকাংশ সময়েই পিসিমা দায়িত্ব নিয়ে বিকেলবেলার শেষে অম্ল-মধুর হাঁক-ডাক করে করে আমাদের ঘুড়ি ওড়ানোর বারোটা বাজিয়ে দিতেন। যাই হোক, এমনই এক শীতের বিকেল শেষে আমি ঘুড়ি-লাটাই সব গুছিয়ে রেখে ছাদে পায়চারী করে বেড়াচ্ছি। এদিক ওদিক দেখে চলেছি যে এখনও কেউ ঘুড়ি ওড়াচ্ছে কিনা। হঠাৎই চোখে পড়লো ছাদে ঠাকুরঘরের মাথার বেশ কিছুটা ওপর দিয়ে সুতোর মতো কি যেন একটা চলে গেছে - শেপটা অনেকটা যেন বিশাল একটা ফ্ল্যাট চন্দ্রবিন্দু। যার একটা দিক ঈশান কোনের জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেছে, আর অন্যদিকটাতে আকাশের প্রায় তারাদের কাছাকাছি, ছোট্ট একটা কালো বিন্দুর মতো কি একটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘুড়ি বলে সেটাকে আদৌ কিছু মনে হচ্ছে না, বরং মনে হচ্ছে যেন আকাশের গায়ে হয়ে থাকা কালো একটা স্পট মাত্র! গায়ের লোম সব খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। পাগলের মতো সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নীচে নেমে এসে মেজদাকে ডেকে নিয়ে এলাম। মেজদাও ভীষণ উত্তেজিত - বললো নিশ্চয় কারোর লাটাইয়ের একদম গোড়া থেকে সুতোটা কেটে গেছে, যাকে ঘুড়ি ওড়ানোর ভাষায় বলে 'উবড়ে যাওয়া' - সেই ঘুড়ি উড়তে উড়তে আকশের একদম উপরের লেয়ারে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। যার একটা কারণ ওটার পিছনে এতো বড়ো লম্বা সুতো আছে যে সেটা বয়ে নিয়ে ঘুড়িটা আর উপরে উঠতে পারছেনা, আর আরেকটা কারণ আকশের ওই উপরের লেয়ারে এখন আর কোনো হাওয়া নেই, তাই ঘুড়িটার নড়বড়ৈ-চ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। তো যাই হোক, এটা অবশ্যই বিশাল কিছু একটা পাওয়া - বিশেষ করে ঘুড়ির সাথে সাথে অতোটা সুতো পাওয়া মুখের কথা নয় - ভীষণ লাকের ব্যাপার। মেজদা মূহুর্তের মধ্যে ঠাকুরঘরের মাথায় উঠে পড়লো। তার পর ছাদে থাকা বিশাল বাঁশের লগাটা উঁচু করে কোনোমতে সেই সুতোটাকে জড়িয়ে ফেলে, ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে আনলো। এই সব কান্ড দেখে উল্টোদিকের বাড়ির ছাদে মোহনদাও উঠে এসেছে। সে বলে চলেছে: 'খুব আস্তে আস্তে টান - সুতোতে প্রচন্ড টান থাকবে...' - বাস্তবিকই তাই, ঘুড়িটা এতদূরে উঠে গেছে যে তার সুতোটার বিশাল একটা পেট হয়ে আছে। মেজদা খুব সাবধানে সুতোটা টেনে টেনে ঘুড়িটাকে নামিয়ে নিয়ে আসলো। পুরো ব্যাপারটা কমপ্লিট হতে প্রায় আধঘন্টা লেগে গেলো। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেই চলেছি। বিশাল একটা বাতিয়াল ঘুড়ি ধীরে ধীরে আমাদের বাড়ির ছাদে অবতরন করলো - যেন ভিনগ্রহের কোন একটা জীব। কালোর উপরে ঘন নীল রঙের দো-তিল ঘুড়ি ছিলো সেটা -  দেখলেই কেমন যেন একটা ভয় আর সম্ভ্রম জাগে। পড়ে পাওয়া অতোটা সুতো গুটিয়ে গুটিয়ে আমার লাটাই ফুলে ফেঁপে বিশাল একটা পটলের আকার ধারণ করে বসলো। 

সব কিছু নির্বিঘ্নে শেষ হয়ে গেলে আমি বললাম: 'মেজদা, সুতোটা কেমন দেখাচ্ছিলো বল, এই সন্ধ্যার আকাশে !' - মেজদা বললো: 'বলতো কিসের মতো ?' - আমি বললাম: 'জানি না তো, কিসের মতো ?' - মেজদা বলে উঠলো: 'দূর বোকা !! জিওমেট্রিতে 'প্যারাবোলা'ও পড়িস নি !! কি পড়ায় কি তোদের স্কুলে !!' 

মেজদার অবজ্ঞাকে থোড়াই কেয়ার করে আমি আনন্দে ডগমগ হয়ে, নাচতে নাচতে ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে নীচে নামতে থাকলাম...

~ ~ ~  * * *  ~ ~ ~

Also published on: ও-কলকাতা-ডট-কম (April 9th, 2014)
LINK: জীবনের প্রথম প্যারাবোলা @ oKolkata.in 



Saturday, November 16, 2013

আপনি বাঁচলে বাপের নাম...

Sachin Tendulkar indulged his fans on an emotional final day - 15 Nov, 2013 
উইলো টিভিতে ফ্রি-তে দেখছিলাম ইন্ডিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা। এমনিতেই মন প্রচন্ড খারাপ, তেন্ডুলকরের অবসরের ডিসিশন - তার উপর হতচ্ছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ !!! %!@$% এতো কম রান করেছে যে ইন্ডিয়ার সেকেন্ড ইনিংসে ব্যাট করার চান্স, প্রায় নয়, পুরোপুরি শুন্য। পাঁচ দিনের টেস্ট খেলাকে এরা যেন ফার্স্ট ফরোয়ার্ড করে তিনদিনে নামিয়ে ফেলেছে - সবেতেই ভীষণ তাড়াতাড়ি - যেন US-র লাইফ।
অবশেষে আমাদের সবাইকে দু:খের অথৈ সাগরে ভাসিয়ে, একগাদা সেন্টু খাইয়ে, ফ্যামিলি নিয়ে এসে নিজেও কেঁদে, শচিন তার ক্রিকেট জীবনের উপর চির-যবনিকা টেনে দিলো। উইকেন্ড শুরুর রাত যেন সোমবার সকালের ভয়ার্ত বেদনা নিয়ে এসে হাজির হলো। এরকম চিনচিনে মন খারাপ ভাব অনেক, অনেকবছর আগে একবার ফীল করেছিলাম, যখন ঝোঁকের মাথায় দেশান্তরী হবার জন্যে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে টাক্সিতে চড়ে বসেছিলাম। কি করে মন ভালো করি, ভাবতে ভাবতে কয়েক যুগ আগেকার মোটা অ্যালবামটা খুলে বোসলাম। অবশেষে পুরানো দিনের বইমেলায়, কলকাতা পুলিশের একটা ছবি দেখে মনটা একটু হালকা হলো। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলা যাক - মানে আজকে তো বলারই রাত - এরপর থেকে কার জন্যেই বা আর টিভি খুলে ক্রিকেট দেখবো !! 

সময়টা তখন বইমেলার মাস - চারিদিকে নানান রকম নাশকতার সম্ভাবনা। বাজারে জোর খবর 'বইমেলায় বোমা উড়বে' - এই বাজারে এক উইকেন্ডের দুপুরে গিয়েছি বইমেলায় ঘুরতে - একা একাই। জ্যামে দাঁড়িয়ে বাসের মধ্যেই কেটে গেলো ঘন্টা দুয়েক। এরপর টিকিট কেটে ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেলো আরও মিনিট চল্লিশেক !! মাথা ক্রমশ: গরম হয়ে উঠেছে। চারিদিকে পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। সাদা-পোশাকের, খাকি পোশাকের, ঘোড়ায় চড়া - কতো রকমের পুলিশ - এ কোথায় এলাম রে বাবা! ঢোকার মুখে শুরু হলো জোরকদমে খানা-তল্লাশ। জেনারালি পুলিশী-হ্যারাসে আমি বিব্রত বোধ করিনা। ছাত্রাবস্থায় বিনা টিকিতে ট্রেনভ্রমণের দৌলতে রেল-পুলিশের সাথে আমার যথেষ্ঠ সখ্যতা গড়ে উঠেছে। কেবল তাদেরকে নয়, বেশিরভাগ কলকাতা পুলিশদেরকেই আমি শুধু 'মামা' নয়, প্রায় আমার হবু 'শ্বশুর-শাশুড়ির' মতো আপনজন বলে মনে করি। কিন্তু সামহাউ আজকের দিনে শরীরটা আমার যুতসই লাগছে না। লাইন দিয়ে শম্মুক গতিতে এগিয়ে চলেছি। দেখি দুটো মোটা, ভুঁড়িওয়ালা পুলিশ ঢোকার গেটে সবার ব্যাগ ভালো করে খুলে, তন্ন তন্ন করে কি সব দেখছে - ওল্টাচ্ছে, ঝাঁকাচ্ছে যেন আমরা ব্যাগে করে ঝুড়ি ঝুড়ি শুঁয়োপোকা নিয়ে ঘুরছি। তাদের ব্যাগ পরীক্ষা করার ভাব-সাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে এ রাজ্যের পুলিশী-প্রশিক্ষণের কি হাল। অবশেষে আমার টার্ন আসতে তাদের একজন আমার সুন্নি-মার্কা ব্যাকপ্যাকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে হেঁড়ে গলায় বলে উঠলো: 'আভি পু-রো খুলকে দিখাও...' - আর যায় কোথা - ব্রহ্মতালু পর্যন্ত আমার যেন চিড়বিড় করে জ্বলে উঠলো। ব্যাটা বাঙ্গালী হয়ে, বাংলার মাঠে দাঁড়িয়ে, তুই কিনা বাঙ্গালীর সামনেই ভুলভাল হিন্দী কপচাসচ্ছিস !! এত্তো বড়ো তোর আস্পর্ধা! আমি খুব সাবধানে ব্যাগটাকে পিঠ থেকে নামিয়ে, জিপারটা সামান্য একটু খুলে তার হাতে দিলাম। যেই না সেই ব্যাটা মুখ তুলে ব্যাগের ভিতরে দেখতে যাবে, আমি আঁতকে ওঠার ভঙ্গি করে চেঁচিয়ে উঠলাম: "সা-ব-ধা-ন ! ফেটে যাবে !!" - ওমনি পুলিশ দুটোর পিলে চমকে গেলো একেবারে। আর যাই কোথা ! সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে আরো কয়েকটা মুশকো পালোয়ান টাইপের সাদা পুলিশ এসে আমাকে ঘিরে ধরলো। এর মাঝে কে একজন ফচ-ফচ করে ছবি তুলতে শুরু করে দিলো। আমি, অবস্থা সুবিধের নয় দেখে, হে-হে করে দেঁতো হাসি হেসে মোলায়েম ভাবে বললাম, "দাদা, এইভাবে যে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে দেখছেন, কারো ব্যাগে যদি সত্যি সত্যি ইয়ে, মানে বিস্ফোরক থেকে থাকে, তো সবার আগে আপনিই ধরা খেয়ে যাবেন - মানে ফুটে যাবেন..." --- কিন্তু ভবি কি ভোলবার! তারপর অনেক কষ্ট করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, আইডেন্টিটি কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখিয়ে, বাড়ির ফোন নাম্বার, অফিসের ফোন নাম্বার, প্রেমিকার ফোন নাম্বার, আমার চোদ্দ পুরুষের আরও একগাদা ইনফরমেশন নিয়ে, পারলে আমার জামা-প্যান্ট খুলে নাঙ্গা করে দেয় এমন ভাব দেখিয়ে, তবে সে যাত্রায় একরকমে উদ্ধার পেলাম! --- কিন্তু কথা'য় আছে না: 'স্বভাব যায় না মলে' - তাই, কিছুটা দূরে গিয়ে আবার আমি অন্য দিক দিয়ে ঘুরে এলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে সেই ব্যাটা দুই পুলিশের ছবি তুলে রাখলাম। ভালোমতোই ডলা খেয়েছি, কিন্তু লক্ষ্য করলাম তারা একটু নার্ভাস হয়ে উঠেছে - আগের সেই পদ্ধতি বাদ দিয়ে তারা আপাতত দূর থেকে সন্দেহজনক ভাবে ব্যাগ পরীক্ষা চালু করেছে, আর মোটামুটি একটু করে দেখেই সব দ্রুত পাস করিয়ে দিচ্ছে !! এখন লাইন ভালো গতিতেই এগুচ্ছে! হু হু বাবা! বললে হবে? সাধে কি বলে "আপনি বাঁচলে বাপের নাম !!"

এবার মনটা একটু ভালো হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে... দেখি ফ্রিজে কিছু আছে কিনা এই বাজারে !!

Wednesday, November 13, 2013

Happy Birthday - Humayun Ahmed (Nov 13)


হুমায়ুন আহমেদের সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় ঘটে বাংলাদেশী BTV চ্যানেলে প্রচারিত হওয়া ধারাবাহিক নাটক 'এইসব দিনরাত্রি' চলাকালীন। বাড়িতে মেজদা তখনো চাকরি পায় নি, তাই শিয়ালদহের কোনো একটা সংস্থায় রেডিও-টিভি রিপেয়ারিং শেখার ট্রেনিং কোর্স শুরু করে দিয়েছিলো। বেশ কয়েকটা ভালো রেডিও খারাপ করে করে হাত পাকানোর পর মেজদা চলে এলো টিভি সারানোতে। শুরু করলো একদম হাতে করে টিভি বানানো, যাকে বলে 'Starting from scratch' - চাঁদনী চক থেকে কিনে আনা হলো একগাদা যন্ত্রপাতি -  মাদার বোর্ড, ধ্যাবা পিকচার টিউব, অজস্র ট্রানজিস্টার, ক্যাপাসিটার, ভাল্ব, গালা, কয়েল, সোল্ডারিং ইনস্ট্রুমেন্ট, আরও কত্তো কি ! মাস খানেক লেগে গেলো সেই টিভিতে প্রথম ছবি আসতে। প্রথমে হিজিবিজি, ঝিলঝিলে ছবি, তারপর শব্দহীন ছবি, শব্দ-আছে-কিন্তু-ছবি-নেই ছবি, তারপরে কনস্টান্ট কাঁপুনি-ধরা ছবি,  ১৮০ ডিগ্রী উল্টোনো ছবি, এরপর মাথা-সরু-দেহ-মোটা কিম্ভুৎকার ছবি, হতে হতে একসময় ছবির কোয়ালিটি কিছুটা স্টেবিলাইজ হোলো। ততোদিনে চোখ কুঁচকে দেখা অভ্যেস করতে করতে নরমাল চোখে টিভি দেখা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি। তার উপর বড়ো একটা আয়না হাতে ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে থেকে হাতের মাসলগুলো সব ব্যায়াম ছাড়াই ফুলে উঠতে শুরু করেছে ! অন্যদিকে সোল্ডারিং করতে গিয়ে ছ্যাঁকা খেয়ে খেয়ে মেজদার বাঁ-হাতের আঙুলগুলোতে বসন্ত রোগের মতো অনেক দাগ দেখা দিয়েছে। কিন্তু সে সব দেখে মনে দু:খের বদলে 'যেমন কর্ম তেমন ফল' টাইপের ভাবই আসতো। যাই হোক নিজের হাতে করা যেকোন জিনিষের মূল্যই আলাদা - হোক না সে সাদা-কালো গোদা টাইপের এক টিভি। বাড়ির ছাদে লাগানো হলো একটা বুস্টার অ্যান্টেনা - শুরু হলো আমাদের বাংলাদেশী প্রোগ্রাম দেখা। অবশ্য সেসময় কলকাতা টিভিতে লোকাল চ্যানেল ছিলো একটাই - তাই বহু বাড়িতেই বুস্টার অ্যান্টেনা লাগিয়ে বাংলাদেশী প্রোগ্রাম দেখার চল ছিলো। 'নাইট রাইডার', 'স্ট্রিট হক', 'A TEAM', 'ম্যাক গাইভার'-এর মতো পপুলার মার্কিনি সিরিয়ালগুলো BTV তখন নিয়মিত দেখাতো। 


যাই হোক 'এইসব দিনরাত্রি' যখন দেখতাম তখনও আলাদা করে নাট্যকার বা ডিরেক্টরের নাম জানার তেমন প্রয়োজন বোধ করিনি, যদিও ওই নাটকের প্রতি অদ্ভুত একটা টান ঠিকই অনুভব করতাম। কিন্তু তারপরে যখন 'কোথাও কেউ নেই' শুরু হলো তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই  নাট্যকারের নাম জেনে নিলাম। এরপর 'বহুব্রীহি' আর 'নক্ষত্রের রাত' চলাকালীন তো আমাদের কলকাতা টিভি দেখার পার্ট তুলে দিতে হলো। নাটকের প্রতিটি চরিত্র: আবুল হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, জাহিদ হাসান, আফজাল হোসেন, আবুল খায়ের - সবাইকেই ভয়ানক ভাবে রক্ত-মাংসের জীবন্ত বলে মনে হতে লাগলো। মা-বাবা থেকে শুরু করে বাড়ির সকলে, এমন কি বাড়ির কাজের মেয়েটি পর্যন্ত উন্মুখ হয়ে বসে থাকতো কখন সেই নাটকগুলোর নেক্সট এপিসোড দেখবে বলে। খুব সম্ভবত প্রতি বৃহস্পতিবার রাত আটটা থেকে ধারাবাহিক  নাটকগুলো শুরু হতো - চলতো বোধহয় ৪৫ মিনিট, কি এক ঘন্টা। মাঝে মাঝে বেশ কিছু বিজ্ঞাপণ হতো, তখন আমাদের বিরক্তির আর শেষ থাকতো না। মেজদার ঘরটা ছিলো এমনিতেই বেশ ছোটো - তো ওই নাটক চলাকালীন সেই ঘরটার অবস্থা হতো দেখার মতো। বিয়ে বাড়িতে রাতে শোবার মতোই 'যে-যেখানে পারি' আমরা বসে পড়তাম কোনো রকমে। কম করে ন'জন মিলে একসাথে বসে (এবং কখনো কখনো দাঁড়িয়ে) আমরা ওই নাটক দেখতাম। এর বছরকয়েক পরে কলকাতা বইমেলা থেকে বেশ কিছু হুমায়ুন আহমেদের বই কিনেছিলাম - তার মধ্যে অবশ্যই 'বহুব্রীহি' ছিলো। তার পরে আস্তে আস্তে পরিচয় ঘটলো 'হিমু' আর 'মিসির আলী' ক্যারেক্টার দুটোর সাথে। 'হিমু'র সাথে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'নীললোহিত' ক্যারেক্টারের কিছুটা মিল আছে - তবে 'হিমু' আরো কেয়ার-ফ্রি টাইপের নির্লোভ উদাস, আরও অনেক বেশি রোমান্টিক, একই সাথে  দার্শনিক ও ফানি, এবং আন-প্রেডিক্টেবল। আবার 'মিসির আলী' ক্যারেক্টারটা ঠিক তার উল্টো! যুক্তিবাদী কঠোর, কঠিন একজন মানুষ - সায়েন্স ও ফিলোসফিকাল লজিকে ভরপুর। এই দুই ক্যারেক্টারের টানাপোড়েনে আমার টিন-এজড চিন্তা-ভাবনা আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। নিজেকে 'হিমু' বলে মনে করার সাথে সাথে, আশেপাশের সমবয়সী মেয়েদের মধ্যে হিমু-র প্রেমিকার ('রূপা') মিল খোঁজার চেষ্টা শুরু হলো !!

একবার মনে আছে ইউনিভার্সিটিতে গ্রাজুয়েশান পড়াকালীন কোনো একটা সেমিস্টারের প্রিপারেশান নিচ্ছি - পরীক্ষার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি, অথচ অনেক কিছুই কভার করা হয়নি। এদিকে হিমুর একটা নতুন প্রেমের উপন্যাসও (খুব সম্ভবত 'ময়ূরাক্ষী' বা 'দরজার ওপাশে') একই সময়ে পড়া শুরু করেছি - ভেরি ভেরি  ব্যাড টাইমিং। তখন বর্ষাকাল চলছে - ভরদুপুর বেলাতেই আকাশ কালো করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে - দেখে মনে হয় যেন ঘোর সন্ধ্যা নেমে এসেছে। যথারীতি লোডশেডিংও শুরু হয়ে গিয়েছে। দোতলার কোনের ঘরেৱ সমস্ত জানালা-দরজা বন্ধ করে আমি হ্যারিকেন জ্বেলে বিছানায় বসে পরীক্ষার পড়া শুরু করেছি। কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারছি না - কেবল মনে হচ্ছে উপন্যাসটার আর একটা চ্যাপ্টার পড়ে নিই, তারপর পরীক্ষার পড়া শুরু করবো। সুতরাং আবার পড়ার বই ছেড়ে গল্পের বই ধরি। তিন-চার বার এই একই পড়ার-বই-থেকে-গল্পের-বই-পড়ার খেলা চললো। নিজের উপরে নিজেরই বিরক্ত লাগা শুরু হলো - কিন্তু কিছুতেই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলাম না। অবশেষে ঠিক করলাম যা হবার হবে, আগে উপন্যাসটার শেষ দেখে নিই, তারপর তেড়েফুঁড়ে  পড়া শুরু করবো। অত:পর টানা দু-ঘন্টা ধরে সেই গল্পের বইটা পড়ে শেষ করলাম, তার পর পরীক্ষার পড়া শুরু হলো। সেই পরীক্ষার রেজাল্ট কি হয়েছিলো তা এখন আর মনে নেই, কিন্তু মনের সেই দোদুল্যমান অবস্থার কথা আজও ভুলিনি। মনে হয় আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই বিভিন্ন সত্তার একাধিক ক্যারেক্টার লুকিয়ে থাকে - সময় বুঝে সাব-ডিউইব্ড ক্যারেক্টারগুলো মাঝে মাঝে আত্মপ্রকাশ করে।

এরপর নিয়মিত ভাবে হুমায়ুন আহমেদের লেখা ফলো করতে লাগলাম - তাঁর লেখা প্রায় সবকটা গল্প-উপন্যাস কিনে ঘর ভরিয়ে ফেললাম। বইমেলা ছাড়াও কলেজ স্ট্রীটের একটা বাংলাদেশী প্রকাশনার দোকানে নিয়মিত যাতায়াত শুরু হোলো। কলকাতার 'প্রতিভাস' পাবলিকেশন থেকেও তাঁর কিছু উপন্যাস ছাপানো হয়েছিলো। পরের দিকে অবশ্য তাঁর লেখাগুলো কিছুটা একঘেয়ে লাগতো। হিমু ক্যারেক্টারও কিছুটা প্রেডিক্টেবল হয়ে উঠেছিলো, প্লাস ঘটনাগুলোর বিষয়বস্তু বা ভেরিয়েশানেরও অভাব দেখা দিয়েছিলো। কিন্তু তা স্বত্তেও হুমায়ুন আহমেদ চলে যাবার পর থেকে বাংলা রোমান্টিক গল্প পড়ার আকর্ষণ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছি। একজন লেখক যে কত রকম দৃষ্টিকোণ থেকে জীবন ও জগৎ দেখেছেন, প্রকৃতির অপার রহস্য, ভূত ও বিজ্ঞান যে কত রকমভাবে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন, তা তাঁর বিভিন্ন লেখার মধ্যে ফুটে উঠেছে। এ রকম জাদুকরী কলম বাংলা সাহিত্যে খুব বেশী আসেনি। নি:সন্দেহে তিনি এই সময়কার অন্যতম শক্তিশালী লেখক ও ঔপন্যাসিক। ওপার বাংলার তো বটেই, এমন কি দুই বাংলা মিলিয়েও তিনি সেরা দশ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে স্বচ্ছন্দে চলে আসবেন।
~~~ শুভ জন্মদিন Humayun Ahmed  ~~~