Tuesday, June 27, 2017

অমলেন্দুর রাগ

জোনাকির দল কি আজও এসে  'হাজির' বলে যায়  ? 
ভেসে ভেসে দেহ জ্বেলে আলো দিয়ে যায়  ?  
বন্ধু, শীতল ছায়ায় এলাম পুরান নদী পার        
বন্ধু, শিউলি হাওয়ায় পেলাম স্মৃতি উপহার . . . 




[ ছবি: ইন্টারনেট ]
অমলেন্দু প্রচন্ড রাগী, জন্ম থেকেই - তার মা, পিসিমা থেকে দেশের বাড়ির ভিখারী-বিড়াল-কুকুর-পাখীরা পর্যন্ত জানে সে'কথা। কিন্তু ঝামেলাটা শুরু হয়েছে মাস আটেক আগে থেকে - এক কথায় বলতে গেলে শিঞ্জিনীর সাথে আলাপ হবার পর থেকে। এখন সে আর ভালো করে রাগতেই পারে না। এই তো, গত সপ্তাহেই তো তাদের একটি ম্যুভি দেখার কথা ছিলো দুপুর তিনটের শো-তে। অমলেন্দু যথারীতি ঘন্টা দেড়েক দেরী করে ফেলেছে - কি করে শিঞ্জিনীর মান ভাঙাবে সেই নিয়ে খান দশেক প্রেমে ভরা, বাছাই করা ঝাড়া-কবিতার লাইন এদিক-ওদিক করে ঠোঁঠস্থ করেও ফেলেছে - কিন্তু কোথায় কি !! শিঞ্জিনী কি আর পাঁচটা মেয়ের মতো ! দেখা হতেই সে একগাল হেসে বললো, "ফোনে কল যাচ্ছে না দেখেই বুঝতে পারলাম যে কাল রাতে তুমি ফোন চার্জে দিতেই ভুলে গেছো, তাই ফোন করে জানাতেও পারছো না। টিকিট দুটো আমি একটা মিষ্টি দেখতে 'Couple'-কে বিক্রি করে দিয়েছি। ছেলেটা আবার জোর করে আমার হাতে পঞ্চাশ টাকা বেশি করে গুঁজে দিলো। চলো, দু'জনে মিলে টিকিট আর এই ফাউয়ে পাওয়া টাকা দিয়ে পেট পুরে ফুচকা খেয়ে ফেলি - তারপর ঝালের চোটে হু-হা-হু-হা করতে করতে, ময়দানে গুনে গুনে তিনবার চক্কর কেটে, নব্বুই ক্যালোরি ঘাম ঝরিয়ে তবে বাড়ি ফিরবো।"  শুনে অমলেন্দুর মাথা থেকে যাবতীয় ভয়-আশঙ্কা কর্পূরের মতো উবে গিয়ে গালটা কেমন যেন হাঁ-হয়ে গেলো ! এ কি মেয়ে রে বাবা !! অ্যাতোদিন সে জানতো মেয়েরা অপেক্ষা করতে ভালোবাসে না - দেরী করে আসলে ক্ষেপে যায়, কথা বন্ধ করে দেয় কিন্তু  শিঞ্জিনী  যেন অন্য কোনো গ্রহের মেয়ে।  সে এসব কখনোই করে না,  বরং অপেক্ষা করতে পছন্দ করে। বলে, "অপেক্ষা করার মতো আনন্দ আর কিছুতে আছে না কি ! 'দেখা হবে' এই ভাবনার মধ্যেই তো আসল আনন্দ আর উত্তেজনা লুকিয়ে আছে - দেখা হয়ে গেলে তো হয়েই গেলো" -  বোঝো !! এরকম কোনো মেয়ের সঙ্গে থাকলে কি কোনোও ভাবে রাগতে পারা যায় !!  


শিঞ্জিনীর সাথে তার প্রথম আলাপও হয়েছিল এই রাগের হাত ধরেই। হাজরার 'এম. এন. কর্পোরেশনে' ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে টানা আড়াইঘন্টা অপেক্ষা করার পর বসের সুন্দরী পি. এ. এসে জানালো যে বাকিদের ইন্টারভিউ সেদিন আর হবে না, পরে ফোন করে সময়মতো জানিয়ে দেওয়া হবে। শুনে অমলেন্দুর পা থেকে মাথার চুলগুলো পর্যন্ত রাগে হিসহিসিয়ে উঠেছিলো। ফেরার সময় ভীড় বাসে এক বয়স্কা মহিলা তার চটির পিছনে এমন ভাবে পা ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো যে নামতে গিয়ে হ্যাঁচকা টানে তার চটির স্ট্র্যাপটাই গেলো ছিঁড়ে ! সেই ছেঁড়া স্ট্র্যাপওয়ালা চটি হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে নিয়ে যাওয়া দেখে কলেজ ফিরতি তরুণী মেয়েগুলো হেসে যেন আর বাঁচে না !! ঝামেলা আর বিপদ কখনো একা একা আসে না। সেটা প্রমান করতেই যেন এসে গেলো আকাশ কাঁপিয়ে টোপা কুলের ঝরে পড়ার মতো বৃষ্টির ঝাঁক। সঙ্গে থাকা ছাতাটার হ্যান্ডেলটাও এই সময় জ্যাম হয়ে গেলো - কিছুতেই সে ব্যাটা খুলতে চাইলো না !! অমলেন্দুর মাথায় তখন রাগের চোটে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করে দিয়েছে। ছাতা খুলবে না, চটি সামলে দৌড় দিয়ে সামনের কোনও একটা দোকানের শেল্টারে গিয়ে দাঁড়াবে, এই দো'টানায় যখন সে পড়েছে, তখনই তার চোখ টানলো রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা, লম্বাটে, ছিপছিপে চেহারার একটা মেয়ে --- দু'হাত দু'দিকে সামান্য মেলে দিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে ইচ্ছা করে ভিজে চলেছে, ঠিক যেন বিরহী যক্ষপ্রিয়া দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথম বর্ষার জলের স্বাদ নিচ্ছে। আকাশী-নীল কুর্তিতে ভিজে চুপসে যাওয়া শিঞ্জিনী তার চোখে যেন আবেশের ঘোর টেনে দিলো। অমলেন্দু ভুলে গেলো স্থান-কাল-পাত্র - ভুলে গেলো তার ব্যর্থ ইন্টারভিউ আর ছেঁড়া চটির দুর্গতির কথা। সারাদিনের ক্লান্তি উবে গিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো - অমলেন্দু বুঝতে পারলো তার জীবনের বারোটা বেজে গেলো সেই ক্ষণ থেকেই। আমহার্স্ট স্ট্রিটে অমলেন্দু স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েই থাকলো, যতক্ষণ না জল জমে উঠে এসে তার গোড়ালি ছাপিয়ে গেলো !! 
[ চলবে... ]


Thursday, June 22, 2017

অচিনপুরের গল্প

[ছবি: ইন্টারনেট]
একা একাই হাঁটছিলাম - ধীরে সুস্থে, এদিক ওদিক দেখে -  অচেনা কিন্তু পুরো অচেনা যেন ঠিক নয় -  রাস্তার ধারে ধারে ঘন জঙ্গল, জ্যোৎস্না আছে বটে, কিন্তু সেই আলোতে খুব বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না। বাঁদিকে একটু এগিয়ে লাহিড়ীদের বিশাল গোল-বাড়ি, দেওয়াল থেকে পলেস্তরা খসে পড়ে পড়ে ইঁটগুলো যেন বিশ্রীভাবে হাসছে - আরেকটু এগিয়ে গেলেই স্কুলের সেই বড়ো মাঠ -  এক ধারের একটা ল্যাম্প পোস্টে টিমটিম করে আলো জ্বলছে।  মাঠের শেষ প্রান্তে কারা কি বসে আছে? একসময় ওখানে বসেই সন্ধ্যার অর্ধেকটা সময় কেটে যেতো - খেলা, পড়াশুনা, কবিতা, প্রেমিকা, পলিটিক্স, সিনেমা থেকে যাবতীয় সরস ও ভাব-আলোচনার ঢেউ বয়ে যেতো। 

নিস্তব্ধতারও এক অচেনা শব্দ আছে - ঝিঁঝির একটানা অসহ্য ডাকে কান যেন ঝিমিয়ে যাচ্ছে - একটু এগোলেই নাট্যভবন, ওখানে নাটকের রিহার্সাল হতো একসময় - সময় মেপে, প্রচুর হাঁক-ডাক করে - এখনও হয়তো হয়, কি হয় না, কে জানে !  বৃষ্টি-ভেজা মাটি থেকে সোঁদা গন্ধ আসছে, কিছুটা যেন অপার্থিব লাগছে, অস্বস্তিকর হলেও ভালো লাগছে। ডাঁয়ে পথটা ঘুরে যেতেই সান্যালদের বাগান, ওখানে কেয়ারী করে ফুলের গাছ ছিলো একসময়।  পরী লাল গোলাপ খুব ভালোবাসতো - পরী কি এখনও আসে আর ? মাঝে-সাঝে, শীতের ছুটিতে ?  মাথার উপরে দুদিকে হেলে থাকা গাছ থেকে টুসটুসে কামরাঙা নিচে পড়ে ফেটে রয়েছে -  দু-চারটে বুনো ফলও, বোধহয় বিষাক্ত --- আরো একটু যেতেই গিরীনদার চায়ের দোকান -  ছিলো, কিন্তু এখন আর নেই।  শনি আর রবিবার করে ওখানে সিঙাড়া-ফুলুরি-বেগুনি-পিয়াঁজি ভাজা হতো -- চারটে একসাথে কিনলে ছোটো এক ঠোঙা মুড়ি ফ্রী-তে মিলতো।  ওখানে দাঁড়িয়েই সময় যেন হূ-হূ করে কেটে যেতো - মিলি স্কার্ট পরে তার বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে কিচিরমিচির করতে করতে একসাথে অঙ্ক-স্যারের বাড়িতে পড়তে যেতো - প্রতি মঙ্গল আর শনিবার করে - ফিরতে ফিরতে হয়ে যেতো সেই রাত দশ'টা, কি তারও পর. . .

হঠাৎ করেই শিরশিরে বাতাস বইতে শুরু করে দিয়েছে - ঠান্ডার পরশে থেকে থেকে শিউরে উঠছি - ছায়াগুলোও কিরকম যেন শীতল শীতল লাগছে। গাছের ডালেরা মাঝে মাঝে ঝাপ্টা মেরে যাচ্ছে - গালে পাতার চকিত স্পর্শ - কেমন যেন ভয়-ভয় ভাব চারিদিকে। আরও একটু সামনে এগোলেই রেল-জংশন...  রথীনদার গলা-কাটা লাশের খবর ভোর-সকালে পেতেই ঘুমচোখে পড়িমরি করে একসাথে ছুটে গিয়েছিলাম। পিয়ালীদির সেদিন কালরাত্রি চলছিলো - কেউ জানাতে যেতে রাজি হয়নি - চারদিনের মাথায় আমি গেছিলাম, পিনটুকে সঙ্গে নিয়ে।  এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলেই দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলাম দু'জনেই. . .  পিয়ালীদির সামনে থাকতে কেমন যেন ঘেন্না করছিলো। সেদিনের সেই স্মৃতিগুলো যেন এখনো চাপ হয়ে ঘুরে-ফিরে মরছে ওখানে। 


* * * * *

ঘন জঙ্গলে ভ'রে থাকা পথ দিয়ে আমি একা একাই হেঁটে চলি  - বন-জ্যোৎস্নায়, নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে, সোঁদা মাটি আর ফেটে থাকা বুনো ফলেদের বিষণ্ণ গন্ধের মধ্যে দিয়ে --- নুইয়ে পড়া গাছের চন্দ্রাতপ শামিয়ানা কেমন যেন ঘোর টেনে আনে চোখে - একদম অন্যরকম, অচেনা। ওখানেই একসময় শব্দ ছিলো, জীবন ছিলো, আর ছিলে তুমি -
   একটু এগোলেই -
         একটু ফিরলেই...




Sunday, April 23, 2017

ফিরে ফিরে আসি, কতো ভালোবাসি...



"আমার চতুর্পাশে, সব কিছু যায় আসে,
আমি শুধু তুষারিত, গতিহীন ধারা..."




প্রায় দীর্ঘ এক বছর বাদে আবার কিছু একটা নিয়ে লিখতে বসলাম - মাঝে শরীর ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো - যে জায়গায় যেতে আমি সবচেয়ে অপছন্দ করি সে জায়াগাতেই, অর্থাৎ হাসপাতালের এমার্জেন্সি রুমে আমায় কাটাতে হলো অসহনীয় তিন রাত, চার দিন। ভাগ্যের অদৃষ্ট পরিহাস বোধ করি একেই বলে !   

স্মৃতিরা হলো যেন অনেকটা জলে ধোয়া ছবির দল। অনেক দৃশ্য আবছা হয়ে গেছে - রং হারিয়ে সাদা-কালো, বা একেবারেই বিবর্ণ হয়ে গেছে - চেষ্টা করলেও আজ আসল রং মনে আসে না। ছোটবেলায় ডায়েরী লেখার অভ্যেসটা মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো আমার সেজদি। শিয়ালদায় স্টেশনে যাবার পথে ফুটপাথের দু'পাশ জুড়ে গজিয়ে থাকা স্টেশনারি দোকান গুলোতে ফুল-পাতার মতো ডাঁই করে থাকা ডায়েরীর স্তুপ থেকে তিনি একটি স্বস্তা ধরণের, ছোট্ট ব্রাউন ডায়েরী কিনে এনে আমাকে বলেছিলেন যে সেটা লিখে শেষ করতে পারলেই আরেকটা 'নতুন' কিনে দেবেন! সেই "আরেকটা নতুন"-এর লোভে পড়ে আমি প্রতি রাতে ঘুমাতে যাবার আগে পালা করে রাত জেগে সারাদিনের কেচ্ছা-কাহিনীর কিছু কিছু কথা, সাল-তারিখ-ক্ষণ দিয়ে তিন-চার পাতা ভ'রে লিখে চলতাম। পরবর্তী কালে দেখা গেলো সেইসব ডায়েরীর লেখা পড়েই দাদা-দিদিরা জেনে ফেলছে সেই কিশোর বয়সে আমার যাবতীয়  'ইনফ্যাচুয়েশেনার'-এর কথা !! অগত্যা নিত্য-নতুন লুকানোর জায়গা খুঁজে বার করতো হতো আমায় ! তবে গ্র্যাজুয়েশনের সময় থেকে লেখার অভ্যেস কমতে কমতে একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো। লেখার জন্যে সময় বার করা মুশকিল হয়ে উঠেছিলো ঠিকই, কিন্তু তার থেকেও খালি মনে হতো যে এইসব ছাইপাঁশ লিখে আর কি হবে!! সেই সব দুঃখ-হতাশার বাতুলতা কেউ কি  না-হেসে কোনোদিনও শুনবে? এখন মাঝে মাঝে মনে বড়ো আফশোষ হয় যে কেন লিখে চললাম না? চললে, আজ স্মৃতিকে অ্যাতো করে তৈলমর্দন করতে হতো না - আর স্মৃতিরাও আমাকে এরকম ভাবে ল্যাজে-গোবরে খেলানোর সুযোগ পেতো না।  


ছোটবেলার দিনগুলো ভরা থাকতো ভালো আর মন্দ, দুইয়েতেই।  স্কুলের দিনগুলোতে যেমন সকালের দিকে বিছানা ছেড়ে উঠতে মন চাইতো না, আবার তেমনিই রোববারের সকালে কিছুতেই সাতটার পর বিছানায় পড়ে থাকতে পারতাম না। সারা সপ্তাহ জুড়ে আমাকে নিয়ম করে পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া আর ঘুমাতে যেতে হলেও, রবিবারের সারাটা দিন-রাত জুড়ে আমার দৌরাত্ম্যতে কেউ কোনো বাধা দিতো না। কোনোরকমে মুখ-হাত ধুয়ে, সকালের জলখাবারের পরেই আমাকে বাবার সাথে যেতে হতো বাজারের দিকে, মূলত: বাজারের থলি বইবার জন্যে। পাড়ার বন্ধুদেরকে দেখাবার জন্যে আমি বাজারের থলিগুলোকে দু'হাতে বেশ গম্ভীরভাবে বয়ে নিয়ে চলতাম যাতে আমাকে কিছুটা বড়ো আর বয়স্ক দেখায়। ঝটপট বেড়ে ওঠার সেই ভয়ানক কুবুদ্ধি যে কেন আমার মাথায় সেদিন ভর করে ছিলো, তা আমি আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না !     
ছেলেবেলা সব দেশেতেই সমান আকর্ষণীয়...
কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাঁদের সান্নিধ্যে এলে মনটা আলোয় ভরে যায় - এক মহৎ উপলব্ধি হয়। যে উপলব্ধি সারা জীবন মনের গভীরে এক আশ্চর্য আলো জ্বালিয়ে রাখে। কালের পাকচক্রে পড়ে সেই মানুষটি হয়তো একসময় আর জীবিত থাকেন না, কিন্তু তাঁর ছড়িয়ে দেওয়া আলোটা থেকেই যায়। সেই কনে-দেখা আলোর আভা স্মৃতিকে আচ্ছন্ন করে রাখে আমাদের বাকি জীবনটা জুড়ে। সেই রকমই একজন মানুষ ছিলেন লাইব্রেরীয়ান নিমাইদা। আমার স্কুল থেকে সামান্য দূরেই ছিলো এক সমৃদ্ধ পাঠাগার। আমার বাবা ছিলেন তার সক্রিয় সভ্য - তবে অফিস শেষে তিনি নিয়ম করে লাইব্রেরি যেতে পারতেন না।  তাঁর জায়গায় বরং আমার ছোটদাই নিয়ম করে সপ্তাহান্তে গিয়ে, দুটি কার্ডে মোট চারটি গল্প-উপন্যাসের বই ইস্যু করে আনতো। ছোটদার হাত ধরেই প্রথম যেদিন নিমাইদার সাথে আলাপ হয়েছিলো তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। তবে তার অনেক আগে থেকেই আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে, স্কুল ফাঁকি দিয়ে বা স্কুল শেষ করে, প্রায় প্রতিদিনই নিয়ম করে 'ইন্দ্রজাল কমিকস', 'শুকতারা', 'আনন্দমেলা' ইত্যাদি পড়ার জন্যে সেখানে গিয়ে ঢুঁ মারতাম। বইপত্র ইস্যু করার টেবিলে সদা-গম্ভীর মুখ করে বসে থাকা সৌম্য চেহারার নিমাইদাকে আমরা সব সময়ই এড়িয়ে চলতাম, কারণ তাঁর মুখোমুখি হলেই তিনি জিজ্ঞাসা করতেন পরীক্ষা কেমন হয়েছে - শেষ পরীক্ষায় অঙ্কে আর ইংরেজিতে কতো নাম্বার পেয়েছি, সায়েন্স পড়াচ্ছেন কোন টীচার, আনন্দবাবু আমাদের কোনো ক্লাস নেন কি না, ইত্যাদি সব কঠিন, বিরক্তিকর প্রশ্ন। সে যাই হোক, ছোটদার হাত ধরে নিমাইদার সাথে সৌজন্যমূলক পরিচয় হতেই তিনি একগাল হেসে ছোটদার কানে তুলে দিলেন যে আমরা দলবেঁধে প্রায় প্রতিদিনই সেখানে স্কুল কেটে ঘন্টাদুয়েক হাজিরা দিয়ে যাই!! ছোটদার মুখে পাহাড়ি সান্যালের মতো "আই সী, আই সী" শুনে বুঝতে পারলাম যে আজ বাড়ি গিয়ে কপালে আমার বিস্তর ঝামেলা অপেক্ষা করে আছে ! 

এরপর থেকে লাইব্রেরী গেলেই নিমাইদা নিয়ম করে আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন বাবা কেমন আছেন, বাড়িতে আমি কি করে সময় কাটাই, কি বই পড়ছি এইসব। এক দিন দুরু দুরু বুকে তাঁর কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম যে শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র আর বিভূতিভূষণের বই কোথায় রাখা আছে। তিনি কিছুটা আপ্লুত স্বরেই বললেন, "এই বয়সে, বিভূতিভূষণ তাও ঠিক আছে, কিন্তু শরৎচন্দ্র পড়ার দুর্বৃদ্ধি কে মাথায় ঢোকালো ?" - আমি আমতা আমতা করে জানালাম যে বাবা বলেছেন, কোনো কিছু শুরু করতে হলে ভালো করেই শুরু করা উচিত - তাই আমি যেন রবীন্দ্র-বঙ্কিম-শরৎচন্দ্র দিয়েই... - শুনে তিনি উচ্চস্বরে হেসে উঠে বললেন, "ঠিকই বলেছেন উনি - এসো আমার সাথে..." ---  তিনি চেয়ার থেকে উঠে আমায় সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন লাইব্রেরীর একটি বিশেষ আলমারীর দিকে - বললেন সেই আলমারীতেই আছে পুরানো দিনের বিখ্যাত সব বই - আমি আমার পছন্দমতো বেছে নিয়ে পড়তে পারি। কি করে ক্যাটালগ দেখে, বা বইয়ের কভারে লাগানো লেবেল পড়ে বই খুঁজতে হয় তাও তিনি সযত্নে বুঝিয়ে দিলেন।   

নিজের হাতে বই খোঁজার বিরল অধিকার পেয়ে আমি উত্তেজনায় কাঁপতে লাগলাম - অজস্র বইয়ে সাজিয়ে রাখা সারি সারি সব বুকশেল্ফ  - বই আর বই, যেন বইয়ের সমুদ্র। পুরানো বইয়ের অদ্ভুত গন্ধে মাথা যেন ধাঁধিয়ে যেতে লাগলো। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম বিবর্ণ, অবহেলিত সেই বুকশেল্ফগুলিতে থরে থরে সাজিয়ে রাখা আমাদের বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সব দিকপাল সাহিত্যিকদের অসামান্য সব রত্নমালা। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে এঁদের অনেকের সাথেই অল্পবিস্তর আলাপ হয়েছে - কিন্তু সে আলাপ তো নগন্য মাত্র - তাতে কি মন ভ'রে? কিন্তু, আজ থেকে তাঁদের সৃষ্ট সাহিত্যের সাথে আমার পরিচয়ের আর কোনো বাধাই রইলো না। এরপর থেকে মাঝে মাঝেই নিমাইদার সাথে আমার সাহিত্য নিয়ে ছোটোখাটো প্রশ-উত্তরের সেশন চলতে থাকলো। সেই সব সেশনের শেষে তিনি কিছুটা অভ্যেসবশতই নিয়ম করে বলতেন, "বই পড়ার অভ্যাসটা কখনো ছেড়ো না, আর কখনও ভুলেও বইকে অসম্মান করো না..."।  

ক্লাস টেন-তে ওঠার অনেক আগেই আমার শেষ হয়ে গেলো শরৎচন্দ্রের যাবতীয় নভেল। এরপর সেই লাইব্রেরী থেকে লাগাতার, অজস্র বই নিয়ে পড়ে চলেছিলাম, এমন কি মাস্টার্স কমপ্লিট হয়ে যাবার পরেও। বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক', শীর্ষেন্দুর 'দিন যায়', সঞ্জীবের 'লোটাকম্বল', তারাশঙ্করের 'হাঁসুলিবাঁকের উপকথা', নারায়ণ সান্যালের 'নাগচম্পা', রমাপদ চৌধুরীর 'বন পলাশীর পদাবলী', বিমল করে 'আত্মজা' নিয়ে তুল্য মূলক বিচার চলতে থাকতো নিমাইদার সাথে। বাংলা ভাষার মহীরুহ থেকে নবীন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের সাথে আমরা যাবতীয় যোগসাজশের সূত্রপাত, বা ভিত্তিস্থাপন ওই লাইব্রেরী আর নিমাইদার হাত ধরেই। 


~ ~ ~ ~ ~ 

কর্মসূত্রে দেশ ছেড়ে চলে আসার আগে, ইচ্ছা থাকলেও নিমাইদার সাথে দেখা করে আসা হয়ে ওঠেনি। বুঝি সম্পর্কের টানে মায়ার বাঁধন অনেক কমে গিয়েছিলো। আজ যদি টাইম মেশিনে করে কোনও ভাবে সেই অকালপক্ক কৈশোর জীবনে ফিরে যেতে পারি, তো নিমাইদার কাছে প্রথমদিনই গিয়ে হাজির হবো।  কোনও কথা বলবো না - স্রেফ বুকে জড়িয়ে তাঁকে ধরে বেশ কিছুক্ষন চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকবো - আর ছাড়বো না 
কিছুতেই...  




Sunday, May 1, 2016

ছেলেবেলা অনেক দূরে ফেলে রেখে এসেছি

ফেসবুক, ট্যুইটার আর হোয়াটস-অ্যাপের চক্করে আজকাল বড়ো থেকে মাঝারি কি ছোটো, কারুরই তেমন দম ফেলার ফুরসত নেই। সময় পেলেই সবাই নাকের ডগায় স্মার্টফোন এনে দু'হাতের আঙুলগুলো দিয়ে অনবরত: পুটুর-পুটুর করে কি যেন সব লিখে চলে। "চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি তোমায় দেখে ফেলেছি"-র যুগ আজকাল চলে গেছে। এখন সব কিছু তো ফেসবুক আর হোয়াটস-অ্যাপেই আগে চলে আসে !

কিন্তু রাত-গভীরে নি:শব্দ আকাশে দৃষ্টির লাগাম ছেড়ে দিয়ে, চাঁদ তারা ছাপিয়ে, দূর থেকে আরো দূরে, সীমাহীন মহাশুন্যের অন্তহীনতা অনুভব করার মজাই আলাদা। মানুষ যে কতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, নগণ্য, তা উপলব্ধি করার জন্যে পয়সা খরচ করে সমুদ্র বা পাহাড়ের কাছে যাবার দরকার নেই - নির্জন রাতের তারাভর্তি আকাশই যথেষ্ঠ।    
ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত 
ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি তখন - গ্রীষ্মের প্রচন্ড খরতাপে এক সপ্তাহ আগে থেকেই আমাদের স্কুলে ছুটি পড়ে গেছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে লোডশেডিং। রাতে খাওদায়ার পাট চুকে গেলে ভাই-বোনেরা  সবাই মিলে ঠিক করলাম বাড়ির ছাদে মশারি টাঙিয়ে ঘুমাবো। সেই মতো অনেক কেরামতি, কসরত করে মশারির চারটে খুঁট কোনোমতে টাঙানো হলো। একটা চাদর আর কয়েকটা বালিশ এনে, ট্যারা-বাঁকা সেই মশারির মধ্যে শুয়ে আমরা ফিসফিস করে গল্প করে চলতেই থাকলাম। তারপর একসময় সব শুনশান - কেবল আমি আর তারাভর্তি আকাশ। ঘুম এসে কখন যে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে গেলো তা টেরও পেলাম না। হঠাই অনেক রাতে ধড়মড় করে উঠে বসলাম - আকাশে আর কোনও তারা নেই। নিকষ কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে গোটা আকাশটা - তার সাথে শুরু হয়েছে দমকা ঝড়ো বাতাস। মশারির দড়ি প্রায় ছিঁড়লো বলে - কালবৈশাখী আসছে সবকিছু তছন করে। আশেপাশে চেয়ে দেখি বাকী সবাই কে কখন ভেগে গেছে - পড়ে আছি শুধু আমি একাই!!  কোনোমতে চাদর আর মাথার বালিশটা বগলে চেপে আমিও দিলাম সিঁড়ির দিকে টানা এক দৌড় - মশারি রইলো পড়ে সেই ছাদেই।

* * * * * *
সেই সব দিন চলে গেছে চিরকালের জন্যে - ফেসবুক, ট্যুইটার কি হোয়াটস-অ্যাপের হাজার কেরামতিতেও সেই সব অনুভুতি আর কখনও ফিরে আসবেনা। মাঝে মাঝে পুরানো দিনের বিস্মৃত-প্রায় কিছু গল্প পড়ি, আর নিজের মনে নিজেই চমকে উঠি সেই সব হারানো স্মৃতির আচমকা জাগরণে।


Monday, April 4, 2016

বিশ্বাসে মিলায়, তর্কে বহুদূর

ঈশ্বর আছেন কি না তা সত্যিই এক বড় রহস্যময় প্রশ্ন। জীবনে বহুবার এমন কিছু অসহায় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি যে মনে হয়েছে যে ঈশ্বরের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া সেখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভবপর ছিলো না। আবার অন্যদিকে বহু জটিল পরিস্থিতিতে ঈশ্বরকে একমনে ডেকেও কোনো লাভ হয়নি। হয়তো বা আমার সেই ডাকের মধ্যে তেমন আকুলতা ছিলোনা, বা নিষ্ঠার অভাব ঘটেছিলো। 

ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আমাদের বাড়িতে নিয়ম করেই দু'বেলা পূজা-আর্চা হতো। নিম্ন-মধ্যবিত্তের সংসারে পুজারী ব্রাহ্মণ ডেকে, মন্ত্র-উচ্চারণ সহ পুজা করার সামর্থ্য আমাদের ছিলো না। অগত্যা ফুল-দূর্বা-ভোগ সহযোগে, কাঁসর-শঙ্খধ্বনি ও ঠাকুর প্রনামের মধ্যে দিয়ে, অনাড়ম্বর ভাবেই মূলত: আমাদের বাড়ির পুজাগুলি সম্পন্ন হতো। সেই কারণেই কি না জানিনা, ছোটবেলায় তেমন কোনো বড়োস দুর্ঘটনা, বা অমঙ্গলের কালো ছায়া আমাদের পরিবারে দেখা দেয়নি। মা-পিসিমা বহুবারই বাড়ির ছাদের ঠাকুরঘরে 'অন্য কোনো এক কিছুর' উপস্থিতি লক্ষ্য করেছিলেন। আমার কপালে তেমন কিছু দেখার সৌভাগ্য না-ঘটলেও গভীর রাতে নূপুরের মিষ্টি-ধ্বনি সহযোগে অদ্ভুত সুন্দর, অপার্থিব কোনো এক কিছুর সুঘ্রাণ বহুবারই আমি ঘুমের মধ্যে উপলব্ধি করেছিলাম।   

জীবনের মাঝপথে এসে বুঝেছি ঈশ্বরের অস্ত্বিত্ব যুক্তি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয় - এটা এক শুধুই অনুভুতি মাত্র। যার মধ্যে ধর্ম নেই, মন্ত্র নেই, বাহ্যিক আড়ম্বর নেই  - আছে শুধু ঐ অনুভুতি। জাগতিক বাস্তব সমস্ত কিছুর বাইরে, অন্য কোনো এক কিছুর অস্তিত্ব। পোশাক, চামড়ার রং, উঁচু জাত-এর গাম্ভীর্য্য থেকে শুরু করে আমরা অনেক কিছু পরে আছি - আস্তরণের পর আস্তরণ দিয়ে আমরা ঢেকে আছি। এক এক রকমের অহংকারের পলেস্তরা ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে থাকা আসল 'আমি'কেই গ্রাস করে  ফেলেছে। সেই আস্তরণ, অহংবোধ থেকে মুক্ত না-হতে পারলে এ জীবনে ঈশ্বরের দর্শন সম্ভবপর নয়। 


Wednesday, September 23, 2015

"অমল মহিমা লয়ে তুমি এলে"

ছোটবেলার কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে স্মৃতিটা মনে ভেসে আসে  সেটা হলো, মাদুরের উপরে বাবু হয়ে বসে দুলে দুলে রবিঠাকুরের 'সহজ পাঠ' থেকে পড়ে চলা সেই কবিতাটা: 'আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে' - তবে বৈশাখ মাসের থেকে শরৎ আর শীতকালের জন্যেই আমরা সবাই মুখিয়ে থাকতাম। শীতকাল মানেই স্কুলের অ্যানুয়াল পরীক্ষা, সেটা কোনোমতে শেষ করে দিতে পারলেই স্বর্গলাভ - যথেচ্ছা খেলা-ধুলা, ঘুড়ি ওড়ানো, গল্পের বই পড়া, মামার বাড়ি যাওয়া, পিকনিক, আরো কত্তো  কি! অন্যদিকে শরৎকাল মানেই দুর্গাপুজো। তা, পুজো তো প্রায় এসেই গেলো - দেখতে দেখতে আবার ঠিক চলেও যাবে। যাওয়া-আসার এই দোলনায় চেপে আমার ছেলেবেলাকার পুজোর দিনগুলো থেকে একটু ঘুরে আসতে ভারি ইচ্ছা করছে। 
(ছবি: ইন্টারনেট)
দুর্গাপুজোর সূত্রপাত হয়ে যেতো 'রান্না পুজো' থেকে। তবে 'রান্না পুজো'র কথা শুনে অনেকে হয়তো ভ্রু কোঁচকাতেই পারেন, কারণ 'রান্না পুজো' হলো পুরোপুরি এদেশীয় অর্থাৎ 'ঘটি'দের বাপকেলে অনুষ্ঠান। রান্না পুজো মানে 'রান্না'-র পুজো আবার সেই সঙ্গে 'অরন্ধন', অর্থাৎ না-রান্নাও বটে! ভাদ্র সংক্রান্তিতে, বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন পরিবারের যাবতীয় মেয়েরা, অর্থাৎ মা-মাসিপিসি, নিজের এবং জ্যাঠতুতো-মাসতুতো দিদি-বোনেরা, সবাই মিলে একজোট হয়ে হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে সারারাত ধরে চালাতো কুটনো-বাটনা আর রান্না - সে ছিলো এক অদ্ভুত আনন্দযজ্ঞ। 'ভাদ্রে রেঁধে আশ্বিনে খাওয়ার' এই রীতির মূলে লুকিয়ে ছিলো এক চিরায়ত বিশ্বাস: 'ভাদ্রের জল হাঁড়িতে পড়লে তবেই নাকি আশ্বিনের ঢাকে বোল ফুটবে, আর ধানের ক্ষেত সব শস্যভারে ফুলেফেঁপে উঠবে'। বাড়ির পুরুষদের কাজ ছিলো রান্নাঘরটাকে ঝাড়াই-পোঁছাই করে রাখা, ব্যাগ বোঝাই করে বাজার করে আনা, উনুনের জ্বালানির জোগাড় করে দেওয়া, টেম্পোরারী কানেকশন দিয়ে ইলেকট্রিক লাইট এবং হ্যাজাকের বন্দোবস্ত করা,  সেই সঙ্গে ক্যাসেট প্লেয়ারে ঝকমারি গানের ব্যবস্থা করা, ইত্যাদি, মানে যত্তোসব অকাজ আর কি! সেই রান্নার বিশাল পর্ব শেষ হতে হতে পরের দিন ভোর না-হলেও, রাত দুটো তো হয়েই যেতো !  না-ঘুমানোর কঠিন পণ করেও কখন যে ঠিক ঘুমিয়ে পড়তাম, কে জানে। ঘুমের মধ্যেই একসময় শুনতে পেতাম শাঁকের আওয়াজ, আর বুঝে যেতাম ব্যস, আমাদের বাড়ির রান্নার পালা সাঙ্গ হয়ে গেছে! পরের সকালে সেই সব রান্নাবান্নার প্রত্যেকটি পদ থেকে একটু করে নিয়ে, শাঁপলাপাতায় সাজিয়ে ভক্তিভরে 'দেবী মনসাকে' সর্বপ্রথমে নিবেদন করা হতো, তারপরে শুরু হয়ে যেতো আমাদের খাওয়া-দাওয়া। হাঁড়িভর্তি পান্তাভাতের সাথে গতরাতের রান্না করা পদগুলি খেতে যে কি অপূর্ব লাগতো, তা বলে বোঝানো যাবে না। এই রান্নাপূজা উপলক্ষ্যে বিভিন্ন বাড়িতে বিভিন্ন রান্নার চল থাকলেও মোটামুটি সব বাড়িতেই 'ডাল শুকনো', ওল, কচুশাক, চিংড়ি-ইলিশ ভাজা, উচ্ছের একটা রান্না, আর গোলগোল করে কাটা মোটা আলুভাজা হতো। আমাদের বাড়ির স্পেশাল আইটেম ছিলো বাগানের নারকেল গাছের নারকেল দিয়ে বানানো পিসিমার নিজের হাতের করা নারকেল-ছাঁই আর নারকেল নাড়ু। গোটা পনেরো বড়ো বড়ো নারকোল ভেঙে কুরনি-বঁটি  দিয়ে কোরা হতো।  পিসিমা খুব মিহি করে নারকোল কোরাতে পারতেন। বেশ কঠিন ছিলো সে'কাজ - ক্রমাগত হাত ঘোরাতে ঘোরাতে একসময় হাতে  ব্যথা হয়ে যেতো - তাই অন্যরাও এসে পালা করে হাত লাগাতেন। সেই কোরা নারকেল কড়াইতে ফেলে ভেজে, তার মধ্যে নলেনগুড় ঢেলে, ময়ান করে বানানো হতো নারকেল নাড়ু - অসাধারন ছিলো তার স্বাদ। গরম অবস্থাতেই নামিয়ে গোল্লা করে নাড়ু বানাতে হতো, কারণ ঠান্ডা হয়ে গেলে সেগুলো আর গোল করা যেতো না। মা-পিসিমা-দিদিদের সবারই হাত ওই তাপে লাল হয়ে যেতো, কিন্তু খেয়ে 'দারুণ হয়েছে' বললেই তাঁদের মুখে ফুটে উঠতো পরিতৃপ্তির অনাবিল হাসি। বাড়ির পুকুর থেকে তুলে আনা শাঁপলাডাঁটার ডাল আর আলপনা দিয়ে সাজানো রান্নাঘরের হাঁড়ি-কড়াইগুলিকে দেখে কেমন যেন গা-ছমছম করে উঠতো। একান্নবর্তী পরিবারের নানান আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে, দাদা-দিদিদের বন্ধু-বান্ধবী, পাড়ার নানান লোকেদের যাওয়া-আসায় আমাদের বাড়িটা সারাটা দিন ধরে গমগম করতো। ফলস্বরূপ রাতের বেলা খেতে বসে পান্তাভাতের সাথে ভালো কিছু আর জুটতো না, অন্তত: চিংড়ি বা ইলিশমাছ ভাজা তো নয়ই! 

ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাওয়াটাই এ জগতের চিরাচরিত নিয়ম। কিন্তু সেই সময়ে আমরা বড্ড বেশি করে চাইতাম 'চট' করে বড়ো হয়ে যেতে।  তা'হলে দাদার মতো একলা একলা সাইকেল চেপে যেখানে খুশি যেতে পারবো, বা কাউকে না-বলেই ট্রেনে চেপে কলকাতা ঘুরে আসতে পারবো, এ'সবই আর কি ! কিন্তু আজ পিছু ফিরে বুঝতে পারি যে কি সাংঘাতিক ভুল চাওয়াই না সেদিন চেয়েছিলাম। 'বড়ো' হওয়া আর 'মেকি' হওয়ার মধ্যে আদপেই যে কোনো পার্থক্য নেই, তা বোঝার ক্ষমতা সেদিনের 'সেই আমি'-র ছিলো না।

'মা' আসছেন (ছবি: ইন্টারনেট)
পাড়ার মোড়ে যখন বিশ্বকর্মা পুজো হতো তখন থেকেই বুঝে যেতাম যে নতুন জামাকাপড়ের পাট ভাঙার সময় এখন না-এলেও, দুর্গাপুজো কিন্তু আর মাত্র কয়েক হাত দূরেই। পরিবেশে যেন একটা পুজো-পুজো গন্ধ সে দিন থেকেই পেতে শুরু করতাম। তার কিছুদিন পরেই হঠাৎ করে এসে যেতো 'মহালয়া'। ভোর সকালে আধো ঘুম আধো জাগরণে,  বীরেনবাবুর মন্দ্রমধুর কন্ঠে চন্ডীপাঠ:  ‘যা দেবী সর্বভূতেষু…’  শুনে চমকে উঠতাম - অকারণেই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো - যাক, পুজো তাহলে সত্যি সত্যিই এসে গেছে!! চোখ কচলে বিছানায় উঠে বসে খেয়াল করতাম কাছে-দূরের সবকটা বাড়ির রেডিও থেকেই মহালয়া শোনা যাচ্ছে। কাছের রেডিওটা যেন দূরের রেডিওটারই প্রতিধ্বনি - তারপর এক সময়ে সবকটা মিলেমিশে যেতো - দূরের বীরেন ভদ্র আর কাছের বীরেন ভদ্র মিলেমিশে এক হয়ে যেতেন। মনে পড়ে ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ গানটা শুরু হবার সাথে সাথেই মা দরজা খুলে দাওয়ায় বেরিয়ে আসতেন, শিউলি-গন্ধ মাখা আবছা আলো আঁধারির সেই ভোরে। আকাশটা লাগতো কেমন অদ্ভুত রকমের শান্ত আর নীলাভ। অচেনা একটা শিরশিরে ভাবে ভরে থাকা, শারদীয়ার সুবাস মাখা সেই ভোরে পাখিদের ঘুম তখনও ভাঙতো না। ‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির, কথাগুলো শুনলেই সারা শরীরে অদ্ভুত এক আবেগ উথলে উঠতো! সে আবেগের পুরোটাই ছিলো নির্ভেজাল আনন্দের। পুজো শুরু হওয়ার আনন্দের সঙ্গে যেমন মিশে থাকতো দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়ে নিয়ম ভাঙার আনন্দ, তেমনই থাকতো পড়াশোনা ভুলে আপন খুশিতে মেতে ওঠার আনন্দ। স্তোত্রে জেগে ওঠা ভোর কেমন করে যেন ‘আধুনিক’ হয়ে যেতো বেলা বাড়ার সাথে সাথেই। মহালয়ার গানের সঙ্গে মিশে যেতো লতা-সলিল-হেমন্ত কিশোর-আশার পুজোর গান। আকাশের ধূসর, গোমড়া মুখটা পাল্টে গিয়ে কি আশ্চর্য্য রকমের ঝকঝকে নীল হয়ে উঠতো। সেই নীল-জুড়ে ভাগ বসাতে চলে আসতো পেঁজা তুলোর মতো সাদা-সাদা মেঘেদের দল। রোদ্দুরটাও হয়ে উঠতো মায়ামাখা, সোনা-রঙা। আর তারই মধ্যে এক সপ্তাহান্তে বাবা বলে উঠেতেন, 'আজ পুরানো গল্পের বইগুলোকে সব রোদ্দুরে দিতে হবে'। ঘরের দেয়ালজোড়া আলমারিগুলোতে থাকা অগুন্তি বইগুলোকে একে একে নিয়ে আমি চলতাম তিনতলার ছাদে মাদুর বিছিয়ে রোদ খাওয়াতে। সবকটা রোদে দেওয়া হয়ে গেলে, বাবা আকাশের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলে উঠতেন: ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি - নাহ্:, আর বৃষ্টি হবে না - শরৎ এসে গেছে...’ - আর অমনিই সেইসব বইয়ের পাঁজা ছুঁয়ে, ঝলমলে সোনা-রঙা রোদ আর একরাশ খুশি নিয়ে আমার মনেও হুড়মুড়িয়ে এসে পড়তো শরৎ।

স্কুলের ছুটি পড়ে যেতো মোটামুটি তৃতীয়া কি চতুর্থীর দিন থেকেই। একমাস ছুটির পরেই থাকতো অ্যানুয়াল পরীক্ষা, কিন্তু দুর্গাপুজো শেষ না-হওয়া পর্যন্ত ভুলেও আমরা পড়ার বইয়ের ধারেকাছে ঘেঁষতাম না। পুজোর কেনাকাটা সারতে আমরা কলকাতার দিকে গেলেও ঠাকুর দেখার সময় কিন্তু নিজেদের এলাকাটা চষে বেড়াতেই পছন্দ করতাম। শহরতলীর মাইল দশেক জায়গা জুড়ে হয়ে থাকা ঠাকুরের সংখ্যা নেহাৎ কমকিছু  ছিলো না। বনেদী বাড়ির পুজো, প্যান্ডেলের পুজো মিলিয়ে গোটাদশেক দেবীপ্রতিমা দর্শন করতেই কেমন করে যেন সময় ফুরিয়ে যেতো। পুজোর নতুন জুতোর দেওয়া "পুজোর ফোস্কা" পায়ে নিয়ে সপ্তমী-অষ্টমী খুঁড়িয়ে 
খুঁড়িয়ে, নবমী থেকে আবার পুরনো জুতো সম্বল করেই মাইলের পর মাইল হেঁটে ঠাকুর দেখা, শেষ হয়েও যেন ঠিক শেষ হতোনা। সকাল হতে না-হতেই নাকেমুখে কিছু গুঁজে প্যান্ডেলে চলে যাওয়া, বাড়ি ফিরতে ফিরতে হয়ে যেতো প্রায় মাঝরাত। ঠাকুর দেখা মানে তো শুধু ঠাকুরের কাছে যাওয়াই নয় - কে কিরকম সেজেগুজে বেরিয়েছে, পরিচিত-স্বল্পপরিচিত সমবয়সী সুন্দরী মেয়েদের দিকে ইতিউতি তাকানো, একটু হাসি, একটু ইশারা, একটু মান-অভিমান, একটু আশা-দু:সাহস - মানে  চটপট প্রেমিক-প্রেমিকা বেছে নেবার মতো এরকম সুলভ সুযোগ বছরে আর দুটো আসতো না। রঙিন ফ্রক আর শাড়ির দল, সামান্য স্নো-পাউডারের প্রসাধনীতে হঠাৎ করেই প্রজাপতির মতো সুন্দরী হয়ে ওঠা মেয়েরা চোখে যেন সম্মোহনের মায়াজাল বুনে দিয়ে যেতো। মোটামুটি সপ্তমীর সকালের মধ্যেই আমাদের পছন্দের লিস্ট কমপ্লিট হয়ে যেতো - তারপরেই শুরু হয়ে যেতো পুজোর প্রেম। সেই প্রেম চলতো টানা কালীপুজো পর্যন্ত। অষ্টমীর অঞ্জলিতে প্যান্ডেলে হয়ে চলা আরতির সময় হাত জোড় হয়ে থাকতো দশভূজা দেবীর দিকে, কিন্তু মুন্ডু আপনা-আপনিই ঘুরে যেতো দ্বিভূজা চিন্ময়ীদের দিকে। কান্ড দেখে দেবী প্রতিমার মুখ হাসিতে ভরে উঠলেও কেন যে সেই মাটির প্রতিমা সজীব হয়ে সে'দিন দশহাতে আমার কানমূলে দিয়ে যাননি তা ভেবে আজ নিজের মনেই আক্ষেপ জাগে!!  রাতের প্রতিমা দর্শনের ফাঁকে ফাঁকে চলতো রাস্তার ধারে ভূঁইফোঁড়ের মত গজিয়ে ওঠা মেক-শিফ্ট স্টলগুলোতে অনবরত: খাওয়া-দাওয়ার পালা। ভীড়ের মধ্যে রীতিমত লড়াই করে ঘুগনি-ফুচকা-আলুকাবলি-এগরোল খতম করার পর থামস-আপের বোতলের শেষ বিন্দুটুকু পর্যন্ত গলায় ঢেলে 'হেউ' করে একটা বিকট শব্দে ঢেঁকুর তোলার মধ্যে কি যেন এক অনাস্বাদিত আনন্দ লুকিয়ে থাকতো, যার দেখা বছরের অন্য কোনো সময়ে মিলতো না।    

দেখতে দেখতেই চলে আসতো দশমী - বিসর্জনের সময়, ঢাকের কাঠিতে বেজে উঠতো বিদায়ের বোল। বুকের ভিতর চলতো উথাল-পাতাল, আবেগের তোলপাড় - মা যে চলে যাচ্ছেন। চোখ ভেঙে নেমে আসতো জল, অভিমানও হতো খুব। তবুও বড়োদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মায়ের চলে যাওয়াকে কান্নাভেজা চোখে দেখতে হতো। ঝড়ের মতো হঠাৎ করেই যে পুজো এসেছিলো, তার চেয়েও দ্রুত বেগে চলে যেতো সে, যেমনটি চিরকালই আসে আর যায়। নবমী নিশি যেন বড়ো দ্রুত অতিক্রান্ত হয়ে যেতো। অনেকদিন আগে এক আধুনিক কবি লিখেছিলেন ---

             “বোধনের ঢুলি বাজাবেই শেষে, 
                            বিসর্জনের বাজনা,
                     থাক থাক সে তো আজ না, 
                                  সে তো আজ নয়, আজ না...”

কিন্তু থাক থাক করে কিছুই কি ধরে রাখা যায়? কিছুই কি ধরে রাখা যাবে? অবশেষে ঢাকের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যায়। শুন্য মন্ডপে সঙ্গীহীন ক্ষীণ প্রদীপশিখা স্মরণ করিয়ে দেয় গতদিনের উৎসব রজনীর কথা। বাতাসে হিমেল ভাব আরেকটু বেড়ে যায়, শরতের শেষ শেফালী ঝরে পড়ে অনাদরে ধুলোভরা রাস্তায়। পুরানো গৃহস্থ বাড়ির ছাদের শিখরে মিটমিটিয়ে জ্বলে ওঠে কোন সনাতন পৃথিবীর অমল আকাশপ্রদীপ...

* * *     * * *     * * *

শরতের সোনা-ঝরা রোদ আর উপচে পড়া খুশি নিয়ে ভরে থাকা আমার ছোট্টবেলার শরৎ আজ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে চলে গেছে আমার প্রিয় মানুষরা, সঙ্গে নিয়ে শরতের সবকটা সোনা-রোদ মাখা ছবি! সেই ছোটবেলার  প্রিয় শরৎ আর কখনোই ফিরে আসবেনা আমার জীবনে। চোখ বুজে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর টুকরো টুকরো ছবি নিয়ে একটা অসম্পূর্ণ কোলাজ তৈরির চেষ্টা করে চলি মনে মনে, যদিও জানি এই কোলাজটা আর সম্পূর্ণ হবেনা কখনোই। দুর্গাপুজো আজ বিশ্বজুড়ে - সচিনকত্তার গাওয়া টাকডুম টাকডুমের ভাঙা ঢোলটা কোথাও তবু যেন একটানা বেজেই চলেছে মনে হয়। 


আজ দেশ ছেড়ে, সাতসমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে এই বিদেশে-বিঁভুইয়ে এসে, এতোটা কাল কাটিয়েও অনুভব করছি ছেলেবেলার সেই সব সোনা-ঝরা দিনগুলোর স্মৃতি ভোলা সহজ কথা নয়। আজন্মের বাড়ি, যেখানে জীবনের প্রথম আনন্দ, প্রথম দুঃখ, প্রথম পাপ আর প্রথম পূণ্যের অনুভব। যেখানে বেড়ে ওঠা, কিশোর থেকে যুবক হওয়া - অথচ কি যেন রহস্যময়, কি যেন নতুন - শিরশিরে, ভয় মেশানো গভীর আনন্দ - সেই জায়গার আকর্ষণ কাটানো মোটেও সহজ কথা নয়। সোনালী ফসলে ভরে থাকা দেশের মাঠ, ভোরের দোয়েল পাখির মিঠে শিস, বাড়ীর পাশে হয়ে থাকা ছোট্ট ফুলের গাছ, শালুক-শাপলার পাতায় বসে থাকা কৃষ্ণকালো ভ্রমর, বৃষ্টিভেজা কদমের অদম্য সুগন্ধ, রুপোলী জরির ফিনফিনে জ্যোৎস্নাভরা রাত, আকাশ ঝমঝম করা তারাদের একদৃষ্টে চেয়ে থাকা, মাঠ শেষের দিগন্তরেখাকে আবীর রাঙা আভায় ভরিয়ে সূর্যের অস্ত যাওয়া, কমলালেবুর গন্ধ-ভরা শীতদুপুরের রোদে পা-মেলে বসে থাকা, নিঝুম আঁধারে ঝোপঝাড়ে বেজে চলা ঝিঁঝিঁদের সম্মিলিত অর্কেস্ট্রা,  এই সবই কি আমাদের জীবনের সব চাইতে বড় পাওয়া নয় ? 



Thursday, August 27, 2015

Disneyland - The Happiest Place on Earth

আশি বা নব্বুইয়ের দশকে যারা বড়ো হয়েছে তারা টেলিভিশনের দৌলতে 'ডিসনী'-র ক্লাসিক সিনেমাগুলি, বা অন্তত: মিকি-মাউস বা লায়ন কিং-এর সাথে মোটামুটি পরিচিত।  এ জগতে কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে গেলে বড়োরা আপনা-আপনিই 'ছোট্ট' হয়ে যায় - ছোট হবার জন্যে আলাদা করে 'ভান' করতে হয় না। ওয়াল্ট ডিসনীর ডিসনীল্যান্ড হলো তেমনই এক স্বপ্নের জগৎ।

~~~ Disneyland - The Happiest Place on Earth ~~~
তবে সত্যি কথা বলতে কি ডিসনীর এই The happiest place on earth”-এ ঢুকতে গেলেই কিন্তু স্বপ্নটা একটু বেশ জোর ধাক্কা খেয়ে যাবে, কারণ এর টিকিট price দেখে। ডিসনী-পার্ক আর ডিসনী-রিসর্ট থেকে আসা রেভেনিউ ক্রমাগত বিপুল হারে বাড়তে থাকা স্বত্তেও ডিসনীল্যান্ড টিকিটের দাম এ'বছরে তিন অঙ্কের ডলার ছুঁয়েছে (ইয়েএএএএ!!!!- তাও এটা শুধু একদিনের, একটাই মাত্র পার্কে ঢোকার মূল্য! দুটো পার্কে ঢোকার টিকিট একসাথে কিনলে বা তিনদিনের টিকিট একসাথে কিনলে সামান্য কিছু ছাড় মেলে, এছাড়া আর কোনও ডিসকাউন্ট এখানে নেই। গুজব আছে যে কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করেই টিকিটের এই আকাশচুম্বী দাম করেছেন যাতে ডিসনীল্যান্ডে দর্শকের ভীড় কিছুটা কম হয় - কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে ওঠেনি। রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে ডিসনীল্যান্ডে গতবছর 16.2 মিলিয়ন দর্শক এসেছেন - যা কিনা 2012-র তুলনায় 1.5% বেশি!!  বেবিফুডের চাহিদার মতোই বাবা-মা-রা তাঁদের ছোট ছোট সন্তানদের মুখে হাসি আনানোর জন্যে যতো দামী টিকিটই হোক না কেন, তা ঠিকই কিনে ফেলেন, আর ক্যাপিটালিস্ট ডিসনী কর্তৃপক্ষ সেটা এতোদিনে ভালো করেই বুঝে গেছেন। সে যাই হোক এই লোভী ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি কুনজর আর না-বাড়িয়ে বরং এবারে আসা যাক আমার সাম্প্রতিকতম ডিসনীল্যান্ড বেড়ানোর অভিজ্ঞতার কাহিনীতে।     


পপুলার যেকোনও 'লং উইকেন্ডে' ডিসনীল্যান্ড গেলে ভীড়ের চোটে সেখানে সারা দিনে গোটা চার-পাঁচেকের বেশি রাইডে ওঠা সম্ভব হয়ে ওঠেনা - এমন কি কয়েকটার 'ফাস্ট পাস' যোগাড় করলেও নয়। কিছু কিছু অত্যাধিক পপুলার রাইডে আবার 'ফাস্ট পাস' থাকে না, তাই সেই গুলোতে ঘন্টা'ভর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায়ও থাকে না। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে খাবারের সন্ধানে গেলেও সেখানে বিশাল লাইন - এমন কি অতি সাধারণ জল-স্ন্যাক্স-সফ্ট ড্রিঙ্কস-আইসক্রিমের জন্যেও !! অবশ্য প্রচুর এনার্জিটিক লোকজন, যারা কিনা পার্ক খোলার আগে গিয়েই লাইনে দাঁড়িয়ে যান, কিম্বা যাঁরা হুইল চেয়ারে বসার সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য লাভ করে থাকেন, তাঁদের কথা এখানে ধরা হচ্ছে না। মূলত: এই ব্যাপারটার দিকে খেয়াল রেখে এবং আরো কিছু 'টেকনিক্যাল সমস্যার' জন্যেই এ'বছর আমরা আগস্ট মাসের মাঝামাঝি এক নন-পপুলার weekdays-এ (সোম থেকে বুধবার) ডিসনীল্যান্ড ঘোরার প্ল্যান করেছিলাম। মূল উদ্দেশ্য ছিলো একটাই - ভীড় এড়ানো, এবং ডিসনীল্যান্ডের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে হয়ে থাকা কিছু স্পেশাল ইভেন্ট/শো দেখা - যতোটা বেশি সম্ভব। তো দেখা গেলো ভীড় এড়ানো আদৌ সম্ভব হয়নি - হয় এখানকার লোকসংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, কিম্বা হয়তো সবাই আমাদের মতো চিন্তা করে উইকেন্ডে না এসে weekdays-ই এসে পড়েছে! নেক্সট, স্পেশাল ইভেন্ট কয়েকটা দেখা গেলেও বেশি রাইড নেওয়া সম্ভব হয় নি, কারণ এখানে বেশীরভাগ রাইডে ওঠার জন্যে মিনিমাম একটা হাইট থাকতে হয়, যেটা হলো কিনা "চল্লিশ ইঞ্চি" - ক্ষেত্র বিশেষে সেটা বেড়ে গিয়ে "আটচল্লিশ ইঞ্চি"-ও (চার ফুট) হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যার জন্যে মূলত: এই ট্রিপে আসা, অর্থাৎ আমার পৌনে-চার বছরের নেক্সট জেনারেশানের হাইট এখনো আটত্রিশ ইঞ্চির বেশি হয় নি !! অগত্যা বেশ অনেককটা পছন্দসই রাইডেই আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।  

~  ~  ~   *   ~  ~  ~

ড্রাইভ করে বে-এরিয়া থেকে LA যেতে গেলে 
'Interstate 5' বা সংক্ষেপে I-ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই - 101-South ধরে বেশ কিছুটা এগিয়ে, গিলরয়ের কাছে গিয়ে CA-152 East নিতে হয়। এই রাস্তায় মাইল চল্লিশেক যাবার পর I-5-র দেখা মেলে। এই I-5 অনেকটা স্কেলের মতোই এক্কেবারে সোজা দু-লেনের হাইওয়ে। অ্যাতোটাই সোজা যে চালাতে চালাতে চোখে ঘুম আসতে বাধ্য ! কিন্তু তা স্বত্তেও এই হাইওয়েতে আমি খুব একটা অ্যাক্সিডেন্ট দেখিনি। আমার কাছে অবশ্য এক-লেনের CA-152E-তে ওই মাইল চল্লিশেক ড্রাইভ দারুন ভালো লাগে। দু'ধারে পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে, ঢেউয়ের মৃদু দোলার মতো দুলতে দুলতে, এঁকে বেঁকে যাওয়া - পথের পাশে থাকা ফ্রেশ ফলমূলের দোকান, সবুজ গাছেদের বাহার, ফার্ম হাউসে ঘোড়াদের চরে বেড়ানো, দিগন্ত বিস্তৃত নাম-না জানা কতো কিছুর চাষের ক্ষেত মনকে ভালো করে দিতে বাধ্য !   
Valley in Green !
Highway CA 152E between Gilroy and Interstate 5

পথের আঁকেবাঁকেই চোখে পড়ে যায় নয় মাইল লম্বা বিখ্যাত 'সান লুইস রিসার্ভার', যা কিনা ক্যালিফোর্নিয়ার 
পঞ্চম বৃহত্তম রিসার্ভার...

I-5-এ ওঠার পর দেখা গেলো গাড়ির সামনে বসে থাকা আমরা দু'জন ছাড়া বাদবাকি সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে - বাইরে টেম্পারেচার দেখাচ্ছিলো 100 ডিগ্রী ফারেনহাইট - মানে যাকে বলে চাঁদি-ফাটা গরম, কিন্তু গাড়ীর এয়ারকন্ডিশনের দৌলতে তেমন কিছু আমাদের মালুম হচ্ছিলো না। I-5-এ খাবারের দোকানের সংখ্যা বেশ কম, মাইল কুড়ি-তিরিশেক অন্তর অন্তর খানকয়েক ফাস্ট ফুডের দোকান আর পেট্রোল পাম্পের দেখা মেলে। বেড়াতে বার হলে Dennys হলো গিয়ে আমাদের প্রিয় খাবারের রেস্তোরাঁ, কারণ এখানে মোটামুটি সব বয়সীদেরই খাবার পাওয়া যায়, আর বসার জন্যে বেশিক্ষণ ওয়েট করতে হয় না, যদিও খাবার সার্ভ করতে ভালোই সময় নিয়ে নেয়। দুপুর গড়িয়ে যাবার পর সামান্য ক্ষিদে পেতে লাগলো, কারণ সকালে ব্রেকফাস্ট কিছুই করে আসিনি। সেই মতো Dennys-র খোঁজে চোখ রেখে চললাম, কিন্তু মাইল কুড়ির মধ্যেও কিছু চোখে পড়লো না - অগত্যা আমরা একটা ম্যাকডোনাল্ড দেখে exit নিলাম। দেখা গেলো সেই একই ম্যাকডোনাল্ডে এর আগেও আমরা বহুবার থেমেছি!! ম্যাকডোনাল্ডের পাশেই রয়েছে "Apricot Tree" বলে একটা 
রেস্তোরাঁ। দেখে ভদ্রস্থ বলে মনে হলেও এর আগে কোনোবারই আমরা সেখানে যাই নি, কারণ, 'না-জানি  কেমন খাবার হবে ' এই ভয়ে!! এইবার সেই jinx ভাঙার সাহস অন্তত: দেখা গেলো। সুতরাং আমরা সবাই মিলে চললাম সেই "Apricot Tree" রেস্তোরাঁর দিকে। গাড়ি থেকে নামার পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যেই টের পেলাম 'দাউদাউ গরম' কাকে বলে!!

Apricot Tree Restaurant @ 46272 W Panoche Rd,  Firebaugh, CA 93622
"Apricot Tree" রেস্তোরাঁটা হলো Harris Ranch পেরুনোর প্রায় ৩০ মিনিট বাদে Pacheco Road exit-এর উপরে। মূলত:  Apricot Pie-এর জন্যে এরা বিখ্যাত হলেও এখানে Dennys-এর মতোই প্রায় সবরকমের ফ্যামিলি স্টাইল খাবার পাওয়া যায়, আর দামও প্রায়  Dennys-এর মতোই। এর আগে আমরা এখানে খেতে আসিনি ভেবে এবার নিজেদেরই একটু বোকা মনে হলো। দোকানে বসে থাকা কাস্টমারদের সিংহভাগই টিপিক্যাল অ্যামেরিকান - আমাদের মতো এশিয়ানদের দেখে তারা যেন একটু অবাক চোখে তাকাতে লাগলো। দুটো টেবিল জোড়া করে আমরা সাতজনে মিলে বসে পড়লাম। দেওয়ালের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই দেখা গেলো সর্বত্র, literally everywhere, নানান রংযের, বিচিত্র বাহারের, বিচিত্র ডিজাইনের লাঞ্চবক্স আর থার্মোফ্লাস্কে ভর্তি - বেশিরভাগ 1950-র দশকের!! খাবার টেবিলের উপরে থাকা ছাদের বীমেতেও থরে থরে সাজানো রয়েছে পুরানো আমলে, ভিনটেজ সব লাঞ্চবক্স। বোঝা গেলো এটাই এই রেস্তোরাঁর বৈশিষ্ঠ্য - দোকানের মালিকের অনন্য চিন্তাশক্তির তারিফ করতেই হয় !! 
Vintage lunchboxes on display at The Apricot Tree Restaurant...


ঢোকার মুখেই থাকা ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা খাবারের মেনু 
ক্ষিদের চোটে একগাদা খাবার অর্ডার করে দেখা গেলো একজনের অর্ডারেই প্রায় দু'জনের দিব্যি চলে যায় - অন্তত: আমার মতো স্বল্পাহারী ভেতো বাঙালীর পক্ষে তো বটেই। অনেক কিছু খাবার নষ্ট করে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম - এবার আমার গাড়ি চালানোর পালা - I-5-এ তখন চোখ ঝলসানো রোদ্দুর...

গাড়ির অ্যাক্সিলেটারে পা-দিতেই গাড়ি গোঁ-গোঁ করে উঠলো, যেন বলতে চাইলো যে "চললে কিন্তু থামতে পারবো না হে বাপু " !! সাতজন প্যাসেঞ্জার, প্লাস তাদের লটবহর নিয়ে গাড়ির 'ভার' এখন যথেষ্ঠই বেশি। গাড়ির রিয়ার-ভিউ মিররগুলো অ্যাডজাস্ট করে, ব্রেকের পজিশানটা ভালো করে 'ফীল' করে নিয়ে, মনে মনে বার কতক 'দুগ্গা-দুগ্গা' আউড়ে চলতে শুরু করে দিলাম। এবারই প্রথম দেখলাম যে I-5 South-এ বেশ কিছু জায়গায় বাঁ-দিকের লেনটা বন্ধ করে দিয়ে, Y-এর মতো আরেকটা টেম্পোরারী রাস্তা তৈরী করে দেওয়া হয়েছে - সম্ভবত: অরিজিনাল বাঁ-দিকের লেন ভালোমতো মেরামত হচ্ছে, যার জন্যে Y-র দুই বাহুর junction-এর কাছে একটা জটলা শুরু হয়ে যাচ্ছে। এরকমই একটা জটলায় পড়ে প্রায় ধাক্কা মারতে গিয়েও মাত্র কয়েক ফুটের জন্যে বেঁচে গেলাম - নিশ্চয় কোনো এক আহাম্মক ওই junction-এর কাছে গিয়ে 'ভ্যাবলা' বনে গেছে !!  আমাদের ভ্যান কিঁ-ই-ই-চ করে জাস্ট কোনমতে থেমে গেলো। 'দুগ্গা' নামের মাহাত্ম্য যে এই কলিকালেও আছে, তা জেনে বেশ খুশিই হলাম। এর পরে বাঁ-দিকের লেন ছেড়ে দিয়ে ডানদিকের লেন দিয়েই চলতে শুরু করে দিলাম। এর পরেও আরো কয়েকটা একই রকমের Y junction দেখলাম, কিন্তু ডানদিকের লেনে থাকায় তেমন কোনো অসুবিধায় আর পড়তে হলোনা। ১৩০ মাইলের মতো যাবার পর আমরা একটা গ্যাস স্টেশনে থেমে, গা-হাত-পা ছাড়িয়ে নিয়ে আইসক্রীম, কোল্ড ড্রিঙ্কস খেয়ে নিলাম। ড্রাইভারও বদল হলো এই তালে। এর পরের রাস্তাটুকু বেশ নির্বিবাদেই কেটে গেলো - তবে রাস্তায় ভালোই ট্র্যাফিকের দেখা মিললো। যাবার পথে একটা সী-বীচঘুরে যাবার প্ল্যান করা হয়েছিলো, কিন্তু LA পৌঁছুতেই বেশ দেরী হয়ে যাওয়ায় সেটার প্ল্যান বাতিল করতে হলো। আমাদের হোটেল বুক করা হয়েছিলো "Marriott"-এ - 1460 S Harbor Blvd-এর উপরে - চার রাত থাকার কথা এখানেই। ডিসনীল্যান্ড পার্ক এই হোটেল থেকে হাঁটাপথে মাত্র পাঁচ মিনিট !! 
Marriott @ 1460 S Harbor Blvd, Anaheim, CA 92808
ইন্টারনেটে হোটেলের ছবি দেখে, বা রুমরেটের বহর জেনে মনে দ্রুত সম্ভ্রম জেগে ওঠে - কিন্তু চেক-ইন করতে গিয়ে সেই সম্ভ্রম একটু ঝাঁকি খেয়ে গেলো - জানা গেলো যে এদের ঘরে মাইক্রোওয়েভের কোনো ব্যবস্থা নেই - এমনকি এক্সট্রা চার্জেও এরা মাইক্রোওয়েভের বন্দোবস্ত করে দিতে পারবেনা, কারণ রুমের ভোল্টেজ-লাইনে নাকি মাইক্রোওয়েভ চালানো যাবেনা, ব্লা-ব্লা-ব্লাহ... অথচ আসার আগে এদেরকেই যখন ফোন করে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, তখন এক মহিলাকন্ঠ হেসে-হেসে দিব্যি বলেছিলো যে ঘরে ঘরে মাইক্রোওয়েভের ব্যবস্থা আছে!!  যাই হোক কি আর করা - তিনতলার ক্যাফেটেরিয়ার কমন মাইক্রোওয়েভেই কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে - তবে আমাদের রুম ছ-তলায় হওয়ায় একটু ওঠা-নামা করতে হবে। হোটেলটা এমন কিছু আহামরি নয়, তবে রুমে ঢুকতেই দেখতে পেলাম দেওয়ালে 'Mater'-এর বেশ বড়সড় একটা sticker সাঁটকানো রয়েছে। এছাড়া সিলিংয়ের দিকে সারা দেওয়াল জুড়ে CARS-এর 'Mater & McQueen'-এর sticker রোল করে লাগানো। দেখেই তো আদি বেজায় উত্তেজিত, আর ভীষণ খুশি !
আমাদের রুম #৬০৪
আমাদের অন্য ঘরটার থীম হলো Disney-র Toy Story মুভির উপর বেস করে। সেখানকার দেওয়ালে Woody-র ছবি সাঁটাকানো। ঘরে ঢুকে হাত-মুখ ধুয়ে, ফ্রেশ হয়ে নিয়ে আমরা রাতের খাবার খেতে বার হলাম - যাওয়া ঠিক হলো 'Chesecake Factory'-তে। এই প্রথম আমার Chesecake Factory-তে খেতে আসা। আলো-আঁধারির দোচলায় পড়ে, কিম্বা খাবারে Cheese-এর আধিক্যের জন্যেই অল্প খাবারেই পেট দম মেরে গেলো। খাওয়া সেরে আমরা কিছু bottled water আর দুধ কেনার জন্যে এখানকার Target-এ গেলাম। সেখান থেকে বাজার সেরে ফেরার পথেই দেখতে পেলাম রাতের আকাশে আলোর রোশনাই - অর্থাৎ ডিসনীল্যান্ড পার্কে সেরাতের 'ফায়ারওয়ার্কস' শুরু হয়ে গেছে। বাজির আলোর ফোয়ারাতে রাতের আকাশ ঝলমল করে উঠেছে। পরের দিনই আমাদের ডিসনীল্যান্ড পার্কে যাবার কথা - ভাবতেই মন আনন্দে নেচে উঠলো। জিনিষপত্র গাড়ির পিছনে রেখে আমরা তাড়াতাড়ি করে গাড়িতে উঠে পড়লাম। এখন আমাদের হোটেলে ফিরে জিনিসপত্র গোছগাছ করে শুয়ে পড়তে হবে, যাতে কাল সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠে রেডী হতে পারি। বেড়ানো শুরু হয়ে গেছে - countdown already started !!! 

DAY-1 (Disneyland Park) - Aug 17, 2015 - সোমবার
প্রত্যেকটা বাঙালি ফ্যামিলির কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ঠ থাকে - এই যেমন  আমাদের ফ্যামিলিতে খুব ছোটোবেলা থেকেই দেখে এসেছি যে কোনো বিষয়েই প্রচুর ভাবনা-চিন্তা করে প্ল্যান করা হয়, কিন্তু কাজের বেলায় দেখা যায় যে কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকেই নজর দিতে আমরা বেমালুম ভুলে গেছি ! 

গতরাতে ঘুম খুব একটা ভালো হয়নি - কারণ একে তো অচেনা জায়গা, তার উপর বিছানাটার দু'ধার ফাঁকা। দুটো বিছানার একটাতে আমি, আর অন্যটাতে আদি আর দেবযানী শুয়েছিলো। কিন্তু আদি ঘুমের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, তাই ওর বিছানার দিকে মাঝেমাঝেই আমাকে নজর রাখতে হচ্ছিলো। ভোরের দিকে ঘুম এলেও স্বপ্নে দেখলাম CARS-এর Mater আমার দিকে চেয়ে কি'সব বলে যেন খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হেসে চলেছে ! সকাল আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে আমরা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম। তিনতলার মাইক্রোওয়েভ থেকে গরম করে আনা দুধ খাওয়া সেরে, আদিও ব্যাকপ্যাক পরে রেডি হয়ে গেলো। গতরাতের খাবার খেয়ে আমার পেট দম মেরে ছিলো, তাই এদিন ব্রেকফাস্ট স্কিপ করে দিলাম। হোটেল থেকে বেরিয়ে একটুখানি হেঁটে আমরা যখন ডিসনীল্যান্ডে টিকিট কেটে ঢুকলাম তখন ঘড়িতে দেখলাম সাড়ে দশটা বেজে গেছে। সোমবার হলেও ডিসনীল্যান্ড আজ লোকে লোকারণ্য ! ঢুকেই Main Street-এর সামনে ডিসনী রেল স্টেশনের সামনে আমরা পোজ মেরে ছবি তুলে নিলাম। 

হোটেল থেকে বার হবার মুখেই টের পাওয়া গেলো যে আমরা আদির সানগ্লাস আনতেই ভুলে গেছি ! অথচ বাড়িতে ওর তিন-তিনটে ভালো সানগ্লাস আছে ! Main Street-এর পথে ডিসনী মুভির নানান পপুলার ক্যারেক্টাররা দাঁড়িয়ে আছে, বাচ্চাদের সাথে ফটো তোলার জন্যে - অবশ্য তাদের প্রতিটির সামনেই বিশাল লাইন। এরকম একটা লাইনে তিতির আর তিরাই দাঁড়িয়ে পড়লো 'মিনি মাউস'-এর সাথে ছবি তোলার জন্যে, আর সেই ফাঁকে আমরা চললাম আদির জন্যে একটা সানগ্লাস কিনতে। দেখা গেলো সানগ্লাসের মতো কমদামী, বা অতি সাধারণ জিনিষ এখানকার বেশিরভাগ দোকানেই থাকে না। বেশ কয়েকটা স্টোর ঘোরার পর অবশেষে একটা বড়ো দোকানে বাচ্চাদের সানগ্লাসের খোঁজ মিললো। প্রায় তিনগুন বেশি দাম দিয়ে একই রকম সানগ্লাস কিনে যখন বেরিয়ে এলাম তখনও বাকিদের 'মিনি'-র সাথে ফটো তোলার চান্স আসেনি। সুতরাং ঠিক হলো আমি আর ইন্দ্র গিয়ে 'ফ্যান্টাসমিক শো'-র ফাস্ট-পাস কালেক্ট করে নিয়ে আসবো, বাকিরা সেই সময়ে ফটো তোলা শেষ হয়ে গেলে মেন স্ট্রীটের ট্রেন রাইডটা সেরে নেবে। সেই মতো আমরা দ্রুত ভীড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চললাম 'Big Thunder Trail'-এর দিকে, সেখানেই ফাস্ট-পাস বিলি করার কথা। মিনিট দশেক হাঁটার পর যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছালাম, তখন দেখলাম বুদ্ধুর মতো আমরা টিকিটগুলোই সঙ্গে করে আনিনি!! টিকিট ছাড়া আবার ফাস্ট-পাস দেবে না - দেওয়া উচিতও নয়! সুতরাং আবার আমরা পেন্ডুলামের মতো ফিরে চললাম টিকিটগুলো নিয়ে আসার জন্যে। ভাগ্য ভালো ছিলো, কারণ তখনও ফাস্ট-পাস ফুরিয়ে যায় নি। অবশেষে ফাস্ট-পাস কালেক্ট করে আমরা ফিরে গিয়ে ট্রেন স্টেশনের সামনে গিয়ে বাকিদের জন্যে ওয়েট করতে লাগলাম। এরপর সবাই মিলে আমরা চললাম রয়াল থিয়েটারের বিখ্যাত FROZEN মিউজিক্যাল শো দেখতে। 
The Royal Theater presents FROZEN

এখানে লাইন একদম ফাঁকা ছিলো, তাই আমরা বেশ তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লাম - পরে অবশ্য বোঝা গেলো যে আসল কারণটা কি। বেশিরভাগ লোকজনই এটার ফাস্ট-পাস কালেক্ট করে রেখেছিলো, তাই তারা শো শুরুর ঠিক আগে এসে হাজির হলো। অবশেষে সবার শেষে আমাদের, অর্থাৎ যাদের ফাস্ট-পাস নেই, তাদের ডাক পড়লো। যদিও আমরা সবাই বসার জায়গা পেলাম, কিন্তু একসাথে বসা আর হলো না। এরপর আমরা চললাম Mark Twain Riverboat-এ রাইড নিতে। 
Mark Twain Riverboat Ride 
এটা একটা বেশ বড়স সেলিং বোট - তাই লাইন বড়ো থাকলেও কোনো অসুবিধা হলো না। আদি এই প্রথম কোনো বোটে চড়লো। বেশ রিলাক্সিং এই রাইডটি। মিনিট তিরিশের এই রাইডে Rivers of America-র Tom Sawyer অ্যাইল্যান্ডের মধ্যে দিয়ে যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হয়। 



যাবার পথে নেটিভ রেড-ইন্ডিয়ানদের জীবনযাত্রা, সুদূর অ্যাইল্যান্ডে বাস করা নানান রকমের বন্য জীবজন্তুদের সাথে যাত্রীদের পরিচয় ঘটে। 



চ ল ছে  - চ ল বে . . . ]