Tuesday, June 27, 2017

অমলেন্দুর রাগ

জোনাকির দল কি আজও এসে  'হাজির' বলে যায়  ? 
ভেসে ভেসে দেহ জ্বেলে আলো দিয়ে যায়  ?  
বন্ধু, শীতল ছায়ায় এলাম পুরান নদী পার        
বন্ধু, শিউলি হাওয়ায় পেলাম স্মৃতি উপহার . . . 




[ ছবি: ইন্টারনেট ]
অমলেন্দু প্রচন্ড রাগী, জন্ম থেকেই - তার মা, পিসিমা থেকে দেশের বাড়ির ভিখারী-বিড়াল-কুকুর-পাখীরা পর্যন্ত জানে সে'কথা। কিন্তু ঝামেলাটা শুরু হয়েছে মাস আটেক আগে থেকে - এক কথায় বলতে গেলে শিঞ্জিনীর সাথে আলাপ হবার পর থেকে। এখন সে আর ভালো করে রাগতেই পারে না। এই তো, গত সপ্তাহেই তো তাদের একটি ম্যুভি দেখার কথা ছিলো দুপুর তিনটের শো-তে। অমলেন্দু যথারীতি ঘন্টা দেড়েক দেরী করে ফেলেছে - কি করে শিঞ্জিনীর মান ভাঙাবে সেই নিয়ে খান দশেক প্রেমে ভরা, বাছাই করা ঝাড়া-কবিতার লাইন এদিক-ওদিক করে ঠোঁঠস্থ করেও ফেলেছে - কিন্তু কোথায় কি !! শিঞ্জিনী কি আর পাঁচটা মেয়ের মতো ! দেখা হতেই সে একগাল হেসে বললো, "ফোনে কল যাচ্ছে না দেখেই বুঝতে পারলাম যে কাল রাতে তুমি ফোন চার্জে দিতেই ভুলে গেছো, তাই ফোন করে জানাতেও পারছো না। টিকিট দুটো আমি একটা মিষ্টি দেখতে 'Couple'-কে বিক্রি করে দিয়েছি। ছেলেটা আবার জোর করে আমার হাতে পঞ্চাশ টাকা বেশি করে গুঁজে দিলো। চলো, দু'জনে মিলে টিকিট আর এই ফাউয়ে পাওয়া টাকা দিয়ে পেট পুরে ফুচকা খেয়ে ফেলি - তারপর ঝালের চোটে হু-হা-হু-হা করতে করতে, ময়দানে গুনে গুনে তিনবার চক্কর কেটে, নব্বুই ক্যালোরি ঘাম ঝরিয়ে তবে বাড়ি ফিরবো।"  শুনে অমলেন্দুর মাথা থেকে যাবতীয় ভয়-আশঙ্কা কর্পূরের মতো উবে গিয়ে গালটা কেমন যেন হাঁ-হয়ে গেলো ! এ কি মেয়ে রে বাবা !! অ্যাতোদিন সে জানতো মেয়েরা অপেক্ষা করতে ভালোবাসে না - দেরী করে আসলে ক্ষেপে যায়, কথা বন্ধ করে দেয় কিন্তু  শিঞ্জিনী  যেন অন্য কোনো গ্রহের মেয়ে।  সে এসব কখনোই করে না,  বরং অপেক্ষা করতে পছন্দ করে। বলে, "অপেক্ষা করার মতো আনন্দ আর কিছুতে আছে না কি ! 'দেখা হবে' এই ভাবনার মধ্যেই তো আসল আনন্দ আর উত্তেজনা লুকিয়ে আছে - দেখা হয়ে গেলে তো হয়েই গেলো" -  বোঝো !! এরকম কোনো মেয়ের সঙ্গে থাকলে কি কোনোও ভাবে রাগতে পারা যায় !!  


শিঞ্জিনীর সাথে তার প্রথম আলাপও হয়েছিল এই রাগের হাত ধরেই। হাজরার 'এম. এন. কর্পোরেশনে' ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে টানা আড়াইঘন্টা অপেক্ষা করার পর বসের সুন্দরী পি. এ. এসে জানালো যে বাকিদের ইন্টারভিউ সেদিন আর হবে না, পরে ফোন করে সময়মতো জানিয়ে দেওয়া হবে। শুনে অমলেন্দুর পা থেকে মাথার চুলগুলো পর্যন্ত রাগে হিসহিসিয়ে উঠেছিলো। ফেরার সময় ভীড় বাসে এক বয়স্কা মহিলা তার চটির পিছনে এমন ভাবে পা ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো যে নামতে গিয়ে হ্যাঁচকা টানে তার চটির স্ট্র্যাপটাই গেলো ছিঁড়ে ! সেই ছেঁড়া স্ট্র্যাপওয়ালা চটি হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে নিয়ে যাওয়া দেখে কলেজ ফিরতি তরুণী মেয়েগুলো হেসে যেন আর বাঁচে না !! ঝামেলা আর বিপদ কখনো একা একা আসে না। সেটা প্রমান করতেই যেন এসে গেলো আকাশ কাঁপিয়ে টোপা কুলের ঝরে পড়ার মতো বৃষ্টির ঝাঁক। সঙ্গে থাকা ছাতাটার হ্যান্ডেলটাও এই সময় জ্যাম হয়ে গেলো - কিছুতেই সে ব্যাটা খুলতে চাইলো না !! অমলেন্দুর মাথায় তখন রাগের চোটে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করে দিয়েছে। ছাতা খুলবে না, চটি সামলে দৌড় দিয়ে সামনের কোনও একটা দোকানের শেল্টারে গিয়ে দাঁড়াবে, এই দো'টানায় যখন সে পড়েছে, তখনই তার চোখ টানলো রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা, লম্বাটে, ছিপছিপে চেহারার একটা মেয়ে --- দু'হাত দু'দিকে সামান্য মেলে দিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে ইচ্ছা করে ভিজে চলেছে, ঠিক যেন বিরহী যক্ষপ্রিয়া দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রথম বর্ষার জলের স্বাদ নিচ্ছে। আকাশী-নীল কুর্তিতে ভিজে চুপসে যাওয়া শিঞ্জিনী তার চোখে যেন আবেশের ঘোর টেনে দিলো। অমলেন্দু ভুলে গেলো স্থান-কাল-পাত্র - ভুলে গেলো তার ব্যর্থ ইন্টারভিউ আর ছেঁড়া চটির দুর্গতির কথা। সারাদিনের ক্লান্তি উবে গিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো - অমলেন্দু বুঝতে পারলো তার জীবনের বারোটা বেজে গেলো সেই ক্ষণ থেকেই। আমহার্স্ট স্ট্রিটে অমলেন্দু স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েই থাকলো, যতক্ষণ না জল জমে উঠে এসে তার গোড়ালি ছাপিয়ে গেলো !! 
[ চলবে... ]


Thursday, June 22, 2017

অচিনপুরের গল্প

[ছবি: ইন্টারনেট]
একা একাই হাঁটছিলাম - ধীরে সুস্থে, এদিক ওদিক দেখে -  অচেনা কিন্তু পুরো অচেনা যেন ঠিক নয় -  রাস্তার ধারে ধারে ঘন জঙ্গল, জ্যোৎস্না আছে বটে, কিন্তু সেই আলোতে খুব বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না। বাঁদিকে একটু এগিয়ে লাহিড়ীদের বিশাল গোল-বাড়ি, দেওয়াল থেকে পলেস্তরা খসে পড়ে পড়ে ইঁটগুলো যেন বিশ্রীভাবে হাসছে - আরেকটু এগিয়ে গেলেই স্কুলের সেই বড়ো মাঠ -  এক ধারের একটা ল্যাম্প পোস্টে টিমটিম করে আলো জ্বলছে।  মাঠের শেষ প্রান্তে কারা কি বসে আছে? একসময় ওখানে বসেই সন্ধ্যার অর্ধেকটা সময় কেটে যেতো - খেলা, পড়াশুনা, কবিতা, প্রেমিকা, পলিটিক্স, সিনেমা থেকে যাবতীয় সরস ও ভাব-আলোচনার ঢেউ বয়ে যেতো। 

নিস্তব্ধতারও এক অচেনা শব্দ আছে - ঝিঁঝির একটানা অসহ্য ডাকে কান যেন ঝিমিয়ে যাচ্ছে - একটু এগোলেই নাট্যভবন, ওখানে নাটকের রিহার্সাল হতো একসময় - সময় মেপে, প্রচুর হাঁক-ডাক করে - এখনও হয়তো হয়, কি হয় না, কে জানে !  বৃষ্টি-ভেজা মাটি থেকে সোঁদা গন্ধ আসছে, কিছুটা যেন অপার্থিব লাগছে, অস্বস্তিকর হলেও ভালো লাগছে। ডাঁয়ে পথটা ঘুরে যেতেই সান্যালদের বাগান, ওখানে কেয়ারী করে ফুলের গাছ ছিলো একসময়।  পরী লাল গোলাপ খুব ভালোবাসতো - পরী কি এখনও আসে আর ? মাঝে-সাঝে, শীতের ছুটিতে ?  মাথার উপরে দুদিকে হেলে থাকা গাছ থেকে টুসটুসে কামরাঙা নিচে পড়ে ফেটে রয়েছে -  দু-চারটে বুনো ফলও, বোধহয় বিষাক্ত --- আরো একটু যেতেই গিরীনদার চায়ের দোকান -  ছিলো, কিন্তু এখন আর নেই।  শনি আর রবিবার করে ওখানে সিঙাড়া-ফুলুরি-বেগুনি-পিয়াঁজি ভাজা হতো -- চারটে একসাথে কিনলে ছোটো এক ঠোঙা মুড়ি ফ্রী-তে মিলতো।  ওখানে দাঁড়িয়েই সময় যেন হূ-হূ করে কেটে যেতো - মিলি স্কার্ট পরে তার বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে কিচিরমিচির করতে করতে একসাথে অঙ্ক-স্যারের বাড়িতে পড়তে যেতো - প্রতি মঙ্গল আর শনিবার করে - ফিরতে ফিরতে হয়ে যেতো সেই রাত দশ'টা, কি তারও পর. . .

হঠাৎ করেই শিরশিরে বাতাস বইতে শুরু করে দিয়েছে - ঠান্ডার পরশে থেকে থেকে শিউরে উঠছি - ছায়াগুলোও কিরকম যেন শীতল শীতল লাগছে। গাছের ডালেরা মাঝে মাঝে ঝাপ্টা মেরে যাচ্ছে - গালে পাতার চকিত স্পর্শ - কেমন যেন ভয়-ভয় ভাব চারিদিকে। আরও একটু সামনে এগোলেই রেল-জংশন...  রথীনদার গলা-কাটা লাশের খবর ভোর-সকালে পেতেই ঘুমচোখে পড়িমরি করে একসাথে ছুটে গিয়েছিলাম। পিয়ালীদির সেদিন কালরাত্রি চলছিলো - কেউ জানাতে যেতে রাজি হয়নি - চারদিনের মাথায় আমি গেছিলাম, পিনটুকে সঙ্গে নিয়ে।  এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলেই দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলাম দু'জনেই. . .  পিয়ালীদির সামনে থাকতে কেমন যেন ঘেন্না করছিলো। সেদিনের সেই স্মৃতিগুলো যেন এখনো চাপ হয়ে ঘুরে-ফিরে মরছে ওখানে। 


* * * * *

ঘন জঙ্গলে ভ'রে থাকা পথ দিয়ে আমি একা একাই হেঁটে চলি  - বন-জ্যোৎস্নায়, নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে, সোঁদা মাটি আর ফেটে থাকা বুনো ফলেদের বিষণ্ণ গন্ধের মধ্যে দিয়ে --- নুইয়ে পড়া গাছের চন্দ্রাতপ শামিয়ানা কেমন যেন ঘোর টেনে আনে চোখে - একদম অন্যরকম, অচেনা। ওখানেই একসময় শব্দ ছিলো, জীবন ছিলো, আর ছিলে তুমি -
   একটু এগোলেই -
         একটু ফিরলেই...